হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (পর্ব ১০)

haioer niil jyamiti prb 10

৩৮ বছর বয়সী সামিনা, ৪৫ বছর বয়স্ক মোর্শেদ। একটি ক্রুজার বাইক। অদম্য প্রেম, মানবিক হেলদোল। চলুন ঘুরে আসি ওদের সাথে।

লেখক: BengaliLekhika

ক্যাটাগরি: ফ্যান্টাসি

সিরিজ: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি

প্রকাশের সময়:15 Mar 2026

আগের পর্ব: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি পর্ব ৯

পর্ব ১০ বিষণ্ণতার প্রতিধ্বনি

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। জানালার বাইরে আকাশটা এখন সিঁদুরে রঙের আভা মেখেছে। সামিনা তার শোবার ঘরের বিছানায় ধপ করে গা এলিয়ে দিল। সারাটা দিন যেন তপ্ত কড়াইয়ের ওপর দিয়ে গেছে। স্কুলে আজ অ্যানুয়াল পরীক্ষার ডিউটি ছিল, তার ওপর খাতা দেখার বাড়তি চাপ। কড়া রোদে ছুটির পর বাসায় ফিরে এক মুহূর্ত জিরোনোর সুযোগ হয়নি। বাবাকে নিয়ে আবার দৌড়াতে হয়েছে ডাক্তারের কাছে। ফোনটা ড্রয়ারের ভেতর পড়ে ছিল সকাল থেকে। চার্জ প্রায় শেষ। লক খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল মোর্শেদের কয়েকটা মেসেজ। সামিনা লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে মেসেজ দিল— সামিনা: “সারাদিন এক মুহূর্ত দম ফেলার সময় পাইনি মোর্শেদ। স্কুলের পরীক্ষার ডিউটি, তারপর বাবাকে নিয়ে ডাক্তার... সব মিলিয়ে একদম নাজেহাল অবস্থা। ফোন হাতে নেওয়ার সুযোগও পাইনি।” সেকেন্ড দশেকের মধ্যেই মোর্শেদের কল এল। সামিনা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মোর্শেদের সেই গম্ভীর কিন্তু পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। মোর্শেদ: “আমি তো ভেবেছিলাম কালকের ওই ‘আস্ত শয়তান’ গালির পর আপনি হয়তো আমাকে আপনার ইকোসিস্টেম থেকে আজীবনের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়েছেন।” সামিনা: (ক্লান্ত গলায় হেসে) “ইচ্ছে তো ছিল। কিন্তু স্কুলের বাচ্চাদের চিৎকারের পর আপনার এই গম্ভীর গলাটা শুনলে মনে হয় একটু শান্তিতে আছি। বাবার রিপোর্টগুলো নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম।” মোর্শেদ: “আংকেল এখন কেমন আছেন? ডাক্তার কী বললেন?” সামিনা: “ডাক্তার ওষুধ পাল্টে দিয়েছেন। বয়স হয়েছে তো, শরীরের ওপর দিয়ে ধকল যাচ্ছে। আচ্ছা মোর্শেদ, এসব তো হলো—এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করি?” মোর্শেদ: “বলুন। আজ আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত।” সামিনা: “আপনি তো আমার অনেক কথাই জানেন। কিন্তু আপনার নিজের ভেতরটা কেন এত অন্ধকার? আমি জানি আপনি ডিভোর্সি। কিন্তু কেন ভেঙেছিল সেই ঘর? আপনার মতো একজন মানুষ, যে কিনা এত যত্ন করে বাইক চালায়, সে কি নিজের সংসারটা আগলে রাখতে পারেনি?” ওপাশে দীর্ঘক্ষণ নীরবতা। কেবল মোর্শেদের সিগারেটের লাইটার জ্বলার শব্দ পাওয়া গেল। এরপর মোর্শেদ খুব ধীর গলায় বলতে শুরু করল। মোর্শেদ: “সংসার আগলে রাখার ইচ্ছেটা দুজনের থাকতে হয় সামিনা। একা টেনে নিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু আগলে রাখা যায় না। আমার প্রাক্তন স্ত্রীর নাম ছিল নীলা। ও ছিল অসম্ভব মেধাবী আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বিয়ের প্রথম দিকে সব ঠিকই ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে ওর কাছে ‘ক্যারিয়ার’ শব্দটা আমার চেয়েও বড় হয়ে উঠল।” সামিনা: “ক্যারিয়ারের জন্য কি মানুষ সংসার ছাড়ে?” মোর্শেদ: “নীলার জন্য সংসারটা ছিল একটা শৃঙ্খল। ও কর্পোরেট ল্যাডারের একদম উঁচুতে উঠতে চেয়েছিল। দিনের পর দিন ও অফিসের কাজে ডুবে থাকত, আর আমি ঘরে ওর ফেরার অপেক্ষায় থাকতাম। আমি চেয়েছিলাম একটা সাধারণ জীবন, যেখানে আমরা একে অপরকে সময় দেব। কিন্তু ওর স্বপ্ন ছিল বিদেশের পোস্টিং, বড় প্রজেক্ট আর ক্ষমতার দাপট।” সামিনা: “আপনি কি ওকে থামানোর চেষ্টা করেননি?” মোর্শেদ: “করেছিলাম। কিন্তু ও খুব স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিল, এই মধ্যবিত্ত আবেগ আর ঘর-সংসারের মায়া ওর সাফল্যের পথে বাধা। একদিন ও এক বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বিশাল পজিশন পেল, কিন্তু শর্ত ছিল ওকে দেশের বাইরে চলে যেতে হবে। ও একবারও আমার কথা ভাবল না। খুব ঠান্ডা মাথায় বলল— ‘মোর্শেদ, তোমার সাথে এই সাধারণ জীবনটা আমার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি আরও উপরে উঠতে চাই, যেখানে তুমি নেই।’ এরপর ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল।” সামিনা: “অদ্ভুত! সাফল্যের চূড়ায় উঠতে গিয়ে মানুষ কি এতটাই একা হয়ে যায়?” মোর্শেদ: “হয়তো। নীলা এখন হয়তো অনেক উঁচুতে আছে, কিন্তু আমার এই ৩৫০ সিসির বাইকের গর্জনের চেয়েও ওর জীবনটা এখন অনেক বেশি যান্ত্রিক। আমি বাধা দেইনি সামিনা। যে মানুষটার মনে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই, তাকে পাশে বসিয়ে রেখে কী লাভ? তাই এখন এই একাকীত্বই আমার সঙ্গী।” সামিনা: “আপনার এই গল্পটা শুনে কেন জানি খুব মায়া লাগছে। আপনি কি এখনো ওকে ঘৃণা করেন?” মোর্শেদ: (ম্লান হেসে) “না সামিনা। ঘৃণা করার মতো তেজও এখন আর নেই। এখন শুধু এক ধরণের শূন্যতা আছে। এই যে হাইওয়েতে ১২০ স্পিডে বাইক চালাই, তখন মনে হয় বাতাস সব স্মৃতি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দিনশেষে যখন এই শূন্য ফ্ল্যাটে ফিরি, তখন সেই নিস্তব্ধতা আবার আমাকে জাপটে ধরে।” সামিনা জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে রইল। তার মনে হলো, মোর্শেদের এই দহন যেন কোথাও গিয়ে তার নিজের জীবনের একাকীত্বের সাথেই মিশে যাচ্ছে। সামিনা: “আমি বুঝি মোর্শেদ। সফল হওয়ার চেয়েও সুখী হওয়াটা বোধহয় অনেক বেশি কঠিন।” ফোনের দুই প্রান্তে তখন দীর্ঘ এক নীরবতা। তবে সেই নীরবতাটা আজ আর অস্বস্তিকর ছিল না। তারা যেন একে অপরের না-বলা ব্যথার ভাগ নিচ্ছিল। সামিনা: “সফল হওয়ার চেয়েও সুখী হওয়াটা বোধহয় অনেক বেশি কঠিন। আপনার সব থেকেও যেন কোথাও একটা বড় শূন্যতা রয়ে গেছে।” মোর্শেদ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) “জানেন সামিনা, আমার জীবনের গল্পটা বাইরের চাকচিক্য দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। খুব ছোটবেলায় আমার বাবা-মা মারা যান। উত্তরাধিকার সূত্রে বনানীতে একটা বাড়ি পেয়েছি, বেইলি রোডে কয়েকটা দোকান আছে। সত্যি বলতে, কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য আমাকে করতে হয় না। ভাড়ার টাকাতেই আয়েশী জীবন চলে যায়।” সামিনা: “তার মানে আপনার হাতে অফুরন্ত সময় আর সম্পদ।” মোর্শেদ: “হ্যাঁ, টাকার কোনো অভাব নেই, সময়েরও কোনো অভাব নেই। কিন্তু আমার যেটা সবচেয়ে বড় অভাব, সেটা হলো মানুষের। আমার এই বিশাল ফ্ল্যাট, এই মেটিওরের গর্জন—সবই বড্ড নিস্পৃহ লাগে মাঝে মাঝে। আমার এত সময়, কিন্তু সেই সময়টুকু কাটানোর মতো কোনো সঙ্গী নেই। আমার বাইক আছে সামিনা, কিন্তু বাইকের পেছনের সিটটা সবসময়ই খালি পড়ে থাকে।” সামিনা: (নিচু স্বরে) “আপনি ঠিক কেমন জীবন চেয়েছিলেন মোর্শেদ?” মোর্শেদ: “আমি খুব সাধারণ কিছু চেয়েছিলাম সামিনা। আমি চেয়েছিলাম এমন একজনকে, যে আমার এই নির্জন ঘরটাকে একটা বাসায় রূপ দেবে। আমাকে সঙ্গ দেবে। আমরা দুজন খুব দেরি করে ঘুম থেকে উঠব, কোনো তাড়াহুড়ো থাকবে না। ইচ্ছে হলে বাইকটা নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে ঘুরে বেড়াবো। কোনো পিছুটান নেই, কোনো কর্পোরেট ল্যাডারে ওঠার চিন্তা নেই—পুরো চিন্তাভাবনাহীন একটা জীবন। আমি শুধু একটা নির্ভেজাল সঙ্গ চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা পাইনি সামিনা। নীলার কাছে আমার এই চাওয়াগুলো ছিল অলসতা আর অর্থহীন।” সামিনা: “আপনার কথাগুলো শুনে বুকটা কেমন ভারী হয়ে যাচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসেও আপনি আসলে সেই ছোটবেলায় হারিয়ে ফেলা আপন মানুষগুলোকেই খুঁজে ফিরছেন, তাই না?” মোর্শেদ: “হয়তো। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই অঢেল সম্পত্তির চেয়ে যদি একটা সাধারণ চাকরি আর একজন ভালোবাসার মানুষ থাকত, যে দিনশেষে আমার ফেরার অপেক্ষায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে, তবে জীবনটা অন্যরকম হতো। আমার এই মেটিওরের পেছনে আপনার মতো কেউ যদি শক্ত করে হাতটা ধরে বসে থাকত, তবে হয়তো হাইওয়ের বাতাসগুলো আজ আর এত বিষণ্ণ শোনাত না।” সামিনা ফোনের ওপাশে নিশ্চুপ হয়ে রইল। তার মনে হলো, মোর্শেদের এই হাহাকার কেবল তার একার নয়; এই যান্ত্রিক শহরের প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে এমন কত শত একাকীত্ব মাথা কুটে মরছে। মোর্শেদ: (গলা ঝেড়ে) "আমার গল্প তো শুনলেন সামিনা। কিন্তু এবার আপনার পালা। আপনার আকাশেও তো মেঘ আছে, তাই না? সামিনা, আপনার ডিভোর্সের কারণটা কি বলা যায়? মানে... কেন টিকল না সেই সম্পর্ক?" সামিনা আচমকা এই প্রশ্নে একটু কেঁপে উঠল। সে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য গলার স্বরে কৃত্রিম চপলতা নিয়ে এল। সামিনা: "আরে ছাড়ুন তো মোর্শেদ সাহেব! ওসব পচা কাসুন্দি ঘেঁটে কী হবে? তার চেয়ে বরং বলুন, আপনার মেটিওরের সার্ভিসিং করানো হয়েছে তো? হাইওয়েতে আবার মাঝপথে ধোঁকা দেবে না তো?" মোর্শেদ: (শান্ত স্বরে) "প্রসঙ্গ ঘুরাবেন না সামিনা। আমি জানি আপনি খুব সুন্দর করে কথা ঘুরিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু আজ আমি আপনার চোখের মণির পেছনের ছায়াটা দেখতে পাচ্ছি। কার ওপর রাগ করে আপনি একা থাকার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন?" সামিনা: (একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করে) "বললাম তো ওসব পুরনো কথা। আসলে আমাদের দুজনের মতের মিল হতো না, ব্যস! অনেক সময় অনেক কিছু হয় না। আপনি বরং ডিনার করেছেন কি না বলুন?" মোর্শেদ: (দৃঢ় কণ্ঠে) "সামিনা, আমি আপনাকে জোর করব না। তবে আপনার এই এড়িয়ে যাওয়াটাই বলে দিচ্ছে ক্ষতটা এখনো কাঁচা। নীলার ক্যারিয়ার প্রীতি আমাকে একা করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আপনার নীরবতা বলছে আপনার গল্পটা বোধহয় আরও বেশি যন্ত্রণার।" সামিনা: (কঠিন গলায়) "যন্ত্রণার হোক বা না হোক, ওটা শুধুই আমার ব্যক্তিগত মোর্শেদ। সবার জীবনের সবটা জানতে নেই। কিছু জিনিস অন্ধকারেই থাকা ভালো।" মোর্শেদ ফোনের ওপাশ থেকে অনুভব করতে পারল সামিনা দেয়াল তুলছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুর নরম করল। মোর্শেদ: "ঠিক আছে সামিনা। আমি দুঃখিত। আপনার যদি খুব আপত্তি থাকে তবে বলার কোনো দরকার নেই। আমি আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। আমি তো শুধু আপনার সেই ইকোসিস্টেমের একটু অংশীদার হতে চেয়েছিলাম।" সামিনা এবার একটু দমে গেল। মোর্শেদের এই নমনীয়তা তাকে অপরাধবোধে ফেলছে। সে খুব নিচু স্বরে বলল— সামিনা: "আপত্তি নেই মোর্শেদ। আসলে সব কথা গুছিয়ে বলা যায় না। কারো কারো গল্প থাকে বিশ্বাসঘাতকতার, কারো থাকে অপমানের। আমারটা হয়তো দুটোরই মিশ্রণ। হয়তো বলতে গিয়ে আমিও লজ্জা পেলাম, আপনিও লজ্জা পেলেন শুনে। কি দরকার দুজনের এরকম অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়ার? সামিনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জানালার গ্রিলটা তার হাতের চাপে ঠান্ডা হয়ে আসছে। ওপাশে মোর্শেদ নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে, যেন সে জানে এই স্তব্ধতার পরেই কোনো এক আগ্নেয়গিরির লাভা বের হয়ে আসবে। সামিনা: (খুব নিচু স্বরে) “আসলে সব কথা গুছিয়ে বলা যায় না মোর্শেদ। কারো কারো গল্প থাকে নিছক বিশ্বাসঘাতকতার, কারো থাকে চরম অপমানের। আমারটা হয়তো দুটোরই মিশ্রণ। সেই গল্পটা শুনলে আমরা দুজনই লজ্জা পেতে পারি, ঘৃণা হতে পারে মানুষের ওপর।” মোর্শেদ: “লজ্জা বা ঘৃণা কোনোটা দিয়েই আমি আপনাকে বিচার করব না সামিনা। আমি শুধু আপনার সেই দহনটা ছুঁয়ে দেখতে চাই। আপনি চাইলে বলতে পারেন।” সামিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার বুকের ভেতর পাথর হয়ে জমে থাকা স্মৃতিগুলো যেন আজ গলতে শুরু করেছে। সামিনা: “আমার বিয়ে হয়েছিল এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের সাথে। বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করত সে। প্রথম এক-দেড় বছর আমাদের জীবনটা আর দশটা সাধারণ দম্পতির মতোই ছিল। কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না, কোনো আভিজাত্য ছিল না—ছিল শুধু ডাল-ভাতের সংসার। আমি তাতেই খুশি ছিলাম। কিন্তু মানুষের লোভ যে কখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কেউ জানে না।” মোর্শেদ: “কী হয়েছিল তারপর?” সামিনা: “হঠাৎ একদিন সে চাকরিটা ছেড়ে দিল। জেদ ধরল সে বিদেশ যাবে, ইউরোপে গিয়ে অনেক টাকা কামাবে। কিন্তু সেই যাওয়ার জন্য তো মোটা অংকের টাকার দরকার। সে সরাসরি আমার বাবার কাছে গিয়ে টাকা দাবি করল। আমার মধ্যবিত্ত বাবার তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়, আমার ছোট বোনের বিয়ের জন্য রাখা টাকা—সব সে এক নিমিষে চেয়ে বসল। এমনকি আমার শ্বশুর-শাশুড়িও ছেলের পক্ষ নিয়ে আমাকে আর আমার পরিবারকে চাপ দিতে শুরু করল। তাদের দাবি ছিল—ছেলের বিদেশ যাওয়ার সব ব্যয় আমার পরিবারকে বহন করতে হবে।” মোর্শেদ: (কঠিন গলায়) “কী অদ্ভুত! তারা কি জানত না আপনাদের সামর্থ্য কতটুকু?” সামিনা: “জানত মোর্শেদ, সব জানত। কিন্তু লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। যখন আমার বাবা সেই টাকা দিতে পারলেন না, তখন শুরু হলো আসল নরক। যে মানুষটা এক সময় আমাকে ভালোবাসার কথা বলত, সেই মানুষটাই একেকটা জানোয়ারে পরিণত হলো। দিনের পর দিন চলল শারীরিক আর মানসিক নির্যাতন। বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে না পারার অপরাধে আমাকে নীল করে দেওয়া হতো। ঘরের অন্ধকার কোণে পড়ে থাকতাম, আর ভাবতাম—এই কি তবে জীবনের মানে?” সামিনার কণ্ঠস্বর কিছুটা বুজে এল। সে একটু থেমে জল গিলে নিল। সামিনা: “শারীরিক ক্ষতগুলো এক সময় সেরে যায় মোর্শেদ, কিন্তু ওই যে সম্মানে আঘাত... আমার বাবাকে ডেকে নিয়ে যখন অপমান করা হয়েছিল, তখন আমি বুঝলাম এই সম্পর্কটা আর সংসার নয়, এটা একটা ফাঁদ। যে মানুষটা আমাকে পণ্য হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, তার সাথে এক বিছানায় শোয়াটাও তখন আমার কাছে মরণযন্ত্রণা মনে হতো। তাই একদিন সব ছেড়ে বের হয়ে এলাম। কোনো মোহ নেই, কোনো পিছুটান নেই। শুধু একজোড়া শূন্য হাত আর একটা ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে।” মোর্শেদ ফোনের ওপাশে স্তব্ধ হয়ে ছিল। সে অনেক মেয়ে দেখেছে, অনেক কর্পোরেট পলিটিক্স দেখেছে, কিন্তু সামিনার এই রূঢ় বাস্তবতার গল্প তাকে যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। মোর্শেদ: “আপনার গল্পটা অপমানের নয় সামিনা, এটা আপনার টিকে থাকার যুদ্ধের গল্প। নীলা আমাকে ছেড়ে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়েছে, আর আপনি আপনার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ঘর ছেড়েছেন। তফাৎটা আকাশ-পাতাল।” সামিনা: “সেদিন থেকে একা থাকার একটা ইকোসিস্টেম বানিয়ে নিয়েছি। যেখানে কেউ নেই, কোনো প্রত্যাশা নেই, তাই কোনো আঘাতও নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে...” মোর্শেদ: “মাঝে মাঝে কী?” সামিনা: “মাঝে মাঝে আপনার মেটিওরের সেই গর্জন শুনলে মনে হয়, এই বন্দিদশা থেকেও বুঝি মুক্তি পাওয়া সম্ভব।” ফোনের দুই প্রান্তে আবার নীরবতা নেমে এল। তবে এবারের নীরবতাটা ছিল সহমর্মিতার। মোর্শেদ অনুভব করল, তার পেছনের খালি সিটটা কেবল একটা মানুষের জন্য নয়, বরং একটা আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করছে।

সামিনার গলার স্বর কিছুটা বুজে এল। ফোনের ওপাশে মোর্শেদ চুপচাপ সব শুনছিল, যেন সে সামিনার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের ওজন মাপার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতিটা কিছুটা হালকা করতে মোর্শেদ এবার সামিনার বর্তমান জীবনের দিকে নজর দিল। মোর্শেদ: “আপনার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে সামিনা, তা ভাবলে অবাক লাগে আপনি আজ এত শান্ত হয়ে স্কুলে বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন কী করে! এই যে শিক্ষকতা করছেন, এই চাকরিটা কি আগে থেকেই ছিল? কতদিন হলো জয়েন করেছেন?” সামিনা: (একটা ম্লান হাসি দিয়ে) “না মোর্শেদ, আমি কোনোদিন চাকরি করতে চাইনি। ডিভোর্সের পর থেকে এই যুদ্ধটা শুরু। বাবার এক বন্ধুর মাধ্যমে এই স্কুলের চাকরির ব্যবস্থাটা হয়েছিল। এখন বছর তিনেক হবে বোধহয়।” মোর্শেদ: “চাকরি করতে চাননি কেন? শিক্ষকতা তো বেশ ভালো পেশা।” সামিনা: (একটু নস্টালজিক গলায়) “আসলে আমি খুব ঘরকুনো আর আদুরে একটা মেয়ে ছিলাম মোর্শেদ। আমি সবসময় স্বপ্ন দেখতাম—আমার একটা ছোট্ট সাজানো সংসার থাকবে, বর অফিস থেকে ফিরলে চা নিয়ে বসব, দিনের শেষে কারো আশ্রয়ে নিজেকে ছেড়ে দেব। আমি কখনওই লড়াকু কোনো নারী হতে চাইনি। আমার ভেতরে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাটা কোনোদিন ছিল না।” মোর্শেদ: “কিন্তু বাস্তবতা আপনাকে লড়াকু বানিয়ে দিল, তাই তো?” সামিনা: “হ্যাঁ। ডিভোর্সের ওই ভয়াবহ ধাক্কাটা যখন এল, আমি তখন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলাম। বাসায় একা বসে থাকলে শুধু সেই দিনের কথাগুলো মনে পড়ত, কান ছিঁড়ে আসত অপমানের শব্দে। একা একা ওই বিষণ্ণতা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। নিজেকে বাঁচানোর জন্য, মাথাটা ব্যস্ত রাখার জন্য এই চাকরিটা শুরু করি। বিশ্বাস করুন, প্রথম কয়েকমাস আমি স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে শুধু কাঁদতাম। তারপর ধীরে ধীরে এই ইকোসিস্টেমে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি।” মোর্শেদ: “তার মানে এই ব্যস্ততা আসলে আপনার জন্য একটা ঢাল। আপনি কি এখনো সেই আদুরে দিনগুলো মিস করেন?” সামিনা: “মাঝে মাঝে করি। তবে এখন আর কারো কাছে আদর পাওয়ার প্রত্যাশা নেই। এখন নিজের পায়ের তলার মাটিটুকুই আমার কাছে পরম আশ্রয়ের। তবে স্কুলের ওই চিৎকার, পরীক্ষার খাতা দেখা—এগুলো না থাকলে হয়তো আমি পাগল হয়ে যেতাম।” মোর্শেদ: (খুব গভীর স্বরে) “মানুষের ভাগ্য কত অদ্ভুত, তাই না? নীলা সব পেয়েও ঘর ছেড়ে ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটল, আর আপনি ঘর বাঁচানোর জন্য সর্বস্ব দিয়েও শেষে বাধ্য হলেন বাইরে বের হতে। অথচ আপনাদের দুজনের চাওয়া ছিল একদম বিপরীত।” সামিনা: “জীবন আমাদের পছন্দমতো চিত্রনাট্য দেয় না মোর্শেদ। আমাদের শুধু অভিনয় করে যেতে হয়।” মোর্শেদ: “ঠিক। তবে এবার আপনার অভিনয়ের বিরতি দরকার সামিনা। অনেক তো যুদ্ধ করলেন, এবার একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিন। আজ বরং অনেক কথা হলো, এবার ঘুমিয়ে পড়ুন। কাল ভোরে আপনার বাচ্চারা আপনার অপেক্ষায় থাকবে।” সামিনা: (মৃদু স্বরে) “শুভরাত্রি মোর্শেদ। কথা বলে আজ অনেক হালকা লাগছে।” মোর্শেদ: “শুভরাত্রি। সাবধানে থেকো।” কলটা কেটে দিয়ে সামিনা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মোর্শেদের শেষ কথাটায় যে ‘তুমি’র ছোঁয়া ছিল, তা যেন তার দীর্ঘদিনের একাকীত্বে একটা উষ্ণ পরশ দিয়ে গেল।