পর্ব ১১
অপেক্ষার নীল দহন
সকাল থেকেই ঢাকার আকাশটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। কড়া রোদ নেই, কিন্তু একটা ভ্যাপসা গরম বাতাসের প্রতিটি অণুতে লেপ্টে আছে। সামিনা তার স্কুলের স্টাফ রুমে বসে এক গাদা পরীক্ষার খাতা নিয়ে যুদ্ধ করছিল, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে ব্যাগের গহীন কোণে রাখা সাইলেন্ট ফোনটার ওপর।
আজ বুধবার। সকাল থেকে একটা মেসেজও আসেনি। মোর্শেদ কি তবে গতকালের সেই মনস্তাত্ত্বিক আলোচনার পর নিজেকে গুটিয়ে নিল? সামিনা লাল কলম দিয়ে একটা খাতায় মার্কিং করতে গিয়ে খেয়াল করল, সে অবচেতনেই খাতার মার্জিনে ছোট ছোট হিজিবিজি কাটছে।
সে একবার আড়চোখে দেখল পাশের টেবিলের সহকর্মী রেহানা আপা গভীর মনোযোগে খাতা দেখছেন। সামিনা দ্রুত ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কোনো নোটিফিকেশন নেই। মেসেঞ্জারের নীল বাতিটাও মোর্শেদের আইডির পাশে জ্বলছে না।
সামিনার মনে হলো, এই নীরবতা যেন বনানীর সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে আসা একটা অদৃশ্য চাবুক, যা প্রতি মুহূর্তে তার মধ্যবিত্ত ধৈর্যকে ক্ষতবিক্ষত করছে। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল— "মানুষটা কি নিষ্ঠুর হতে ভালোবাসে? নাকি সে জানে আমি এখন ঠিক কতটা অস্থির?"
স্টাফ রুমের সিলিং ফ্যানটা গোঁ গোঁ শব্দে ঘুরছে, কিন্তু সামিনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। খাতার পাতায় লাল কালির আঁচড়গুলো এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। ঠিক এই সময়েই রেহানা আপা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে তার দিকে তাকালেন।
রেহানা আপা: “কী হলো সামিনা? একটা খাতা নিয়ে পনেরো মিনিট ধরে বসে আছ। শরীর খারাপ নাকি?”
সামিনা চমকে উঠে কলমটা টেবিলের ওপর ফেলে দিল। লজ্জিত হাসির আড়ালে নিজের অস্থিরতা ঢাকতে গিয়ে বলল— সামিনা: “না আপা, ঠিক আছে। আসলে... এই ভ্যাপসা গরমে ঠিক মন বসছে না।”
রেহানা আপা একটু তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। তিনি অভিজ্ঞ মানুষ, সামিনার চোখের নিচের কালি আর বারবার ফোনের দিকে তাকানোটা তার নজর এড়ালো না। রেহানা আপা: “মন গরমে বসছে না, নাকি অন্য কোথাও উড়াল দিয়েছে? আজকাল তোমাকে বড্ড অন্যমনস্ক লাগে। কোনো সমস্যা?”
সামিনা: “না আপা, তেমন কিছু না। বাবার শরীরটা একটু খারাপ তো, ওটাই ভাবছিলাম।”
মিথ্যেটা বলতে গিয়ে সামিনার বুকটা একটু কেঁপে উঠল। অথচ সে জানে, বাবার অসুস্থতার চেয়েও বড় একটা ‘অসুখ’ তাকে এখন কুরে কুরে খাচ্ছে। সেই অসুখের নাম মোর্শেদ। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী এক উদ্ধত পুরুষ, যে কিনা কেবল তার নীরবতা দিয়ে সামিনাকে শাসন করছে।
টিফিনের ঘণ্টার শব্দে সামিনা যেন মুক্তি পেল। পরের ক্লাসটা নাইন-এর। ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডে ভূগোলের ম্যাপ আঁকতে গিয়ে সে হঠাৎ থমকে গেল। সে আঁকতে চেয়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্র, কিন্তু তার হাত যেন নিজের অজান্তেই হাইওয়ের সেই আঁকাবাঁকা ‘নীল জ্যামিতি’ আঁকার চেষ্টা করছে—যেটার গল্প মোর্শেদ তাকে শুনিয়েছিল।
ছাত্রীরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। সামিনা সংবিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি ডাস্টার দিয়ে সব মুছে ফেলল।
সামিনা: (গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে) “সরি মেয়েরা, আমার আজ একটু মাথা ধরেছে। তোমরা বইয়ের চ্যাপ্টার ফোর টা রিডিং পড়ো।”
সে ক্লাসের শেষ বেঞ্চের জানালার দিকে তাকাল। বাইরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামিনার মনে হলো, সে আসলে কোনো স্কুলের ক্লাসরুমে নেই, সে আটকে আছে একটা ডিজিটাল গোলকধাঁধায়।
সে আবার ফোনটা বের করল। এবার আর কেবল দেখা নয়, সে টাইপ করতে শুরু করল। ‘আপনি কি খুব ব্যস্ত?’ না, এটা খুব সাধারণ শোনায়। ‘বেঁচে আছেন তো?’ না, এটাও বেশি অধিকারবোধ প্রকাশ করে ফেলে।
শেষে সে কিছুই পাঠাতে পারল না। মোর্শেদের সেই দামী পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার ‘তুমি’ সম্বোধনের সেই ভারিক্কি স্বর যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। মোর্শেদ কি জানে, তার এই নীরবতা সামিনার শিক্ষক সত্তা আর সংসারী রূপটাকে ছাপিয়ে কেবল এক তৃষ্ণার্ত নারীর হাহাকার জাগিয়ে তুলছে?
স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার পথে রিকশায় বসেও সামিনা স্বস্তি পেল না। বিকেলের মরা রোদটা যেন তার শরীরের ওপর বিষের মতো চুইয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের পরিচিত এই জ্যামিতিক ঢাকা শহরটাকে আজ বড্ড অপরিচিত লাগছে। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, এই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে সে ভীষণ একা, আর তার এই একাকীত্বের চাবিকাঠিটা এখন বনানীর কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ড্রয়ারে বন্দি হয়ে আছে।
বাসায় ঢোকার পর প্রথম ধাক্কাটা এল বাবার ঘর থেকে। বাবা কাশছেন। সেই চেনা খুসখুসে কাশি, যা শুনলে সামিনার বুকটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু আজ সেই কাশির শব্দ ছাপিয়েও তার কানে বাজছে মোর্শেদের সেই গম্ভীর স্বরে বলা— “আপনার অভিনয়ের বিরতি দরকার।”
সামিনা রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে পানির বোতল বের করল। গপগপ করে পানি খেয়েও যেন বুকের ভেতরকার সেই মরুভূমিটা ভিজছে না।
মা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে বললেন, “কী রে সামিনা? শরীর খারাপ নাকি? মুখটা ওরকম শুকিয়ে আছে কেন?”
সামিনা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না মা, রোদে একটু ধকল গেছে। আমি একটু শুতে যাচ্ছি।”
নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল সে। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে রইল কিছুক্ষণ। শরীরটা অবসন্ন, কিন্তু মস্তিষ্কটা অবাধ্য ঘোড়ার মতো ছুটছে। সে ফোনটা হাতে নিল। চারটে বেজে দশ মিনিট। মোর্শেদ এখনো অনলাইনে আসেনি। সামিনার মনে এক ধরণের আদিম হিংস্রতা দানা বাঁধছে। কেন মোর্শেদ তাকে এভাবে ঝুলিয়ে রাখছে? সে কি তবে মোর্শেদের কাছে কেবল একটি সাময়িক বিনোদন?
বিছানার এক কোণে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সামিনা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী এক অভিজ্ঞ শিকারী কি তবে তাকে স্রেফ টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে? সামিনার মনে হলো, সে আসলে মোর্শেদের ইকোসিস্টেমের কেউ নয়, সে কেবল তার রয়্যাল এনফিল্ডের ইঞ্জিনের তপ্ত ধোঁয়ার মতো— যা কিছুক্ষণ দৃশ্যমান থাকে, তারপর বাতাসে মিলিয়ে যায়।
বিছানা ছেড়ে সামিনা আলসেমি ভাঙল না, বরং এক ধরণের যান্ত্রিক ঘোরের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। শরীরটা বড্ড ভারী লাগছে, যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে আছে একরাশ বিষাদ আর তৃষ্ণা। সে ধীর পায়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার ছিটকিনিটা আটকানোর শব্দটা আজ তার কানে বড্ড নির্জন শোনাল।
শরীরের কাপড়গুলো আলগা করতে করতে সে আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। মধ্যবয়স্ক এই শরীরে এখনো যে লাবণ্য অবশিষ্ট আছে, মোর্শেদ কি তার সমঝদার হতে পারবে? নাকি সে কেবল দূর থেকে শব্দের মায়া ছড়িয়ে একে একে সবটুকু শুষে নিতে চায়?
শাওয়ারটা ছেড়ে দিতেই শীতল জলের ধারা তার ঘাড় আর পিঠ বেয়ে নামতে শুরু করল। সামিনা চোখ বন্ধ করল। জলের প্রতিটি স্পর্শে সে যেন মোর্শেদের সেই লম্বা, অভিজ্ঞ আঙুলগুলোর স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। মোর্শেদ কি এভাবেই তাকে ছুঁতে চাইত? শাওয়ারের ঝিরঝিরে শব্দটা তার কানে এখন মোর্শেদের সেই গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ গলার স্বর হয়ে বাজছে— “তোমার এই অভিনয়ের বিরতি দরকার সামিনা।” নিজের অবাধ্য হাত দুটো যেন তার অজান্তেই শরীরের স্পর্শকাতর ভাঁজগুলোতে বিচরণ করতে শুরু করল। সাবানের ফেনাগুলো যখন তার বুকের খাঁজ বেয়ে নিচে নামছে, সামিনা কল্পনা করল—এটা জল নয়, এটা মোর্শেদের সেই দামী পারফিউমের ঘ্রাণমাখা উষ্ণ নিশ্বাস। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দঁড়িয়ে রইল। মোর্শেদের ‘তুমি’ সম্বোধনটা তার মনে এক ধরণের অদ্ভুত শিরশিরানি জাগিয়ে তুলছে। সে ভাবল, মোর্শেদ যদি এখন এখানে থাকত, তবে কি সে এভাবেই তার ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিত? তার ওই অভিজ্ঞ চোখের দৃষ্টি কি এভাবেই সামিনাকে নগ্ন করে ফেলত?
কামনার এক তীব্র ঢেউ তার তলপেট থেকে উঠে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সামিনা দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল যাতে আর্তনাদটা বাইরে বেরিয়ে না আসে। এই বাথরুমের চার দেয়ালের ভেতর সে আজ আর কোনো স্কুলের শিক্ষিকা নয়, সে কেবল এক তৃষ্ণার্ত নারী, যে তার অদৃশ্য প্রেমিকের কাল্পনিক ছোঁয়ায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে। মোর্শেদ তাকে অবহেলা করছে, অথচ তার সেই অবহেলাই সামিনাকে আরও বেশি করে তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গোসল শেষে তোয়ালে দিয়ে শরীর মোছার সময় সে আয়নার ঝাপসা বাষ্পের ওপর নিজের আঙুল দিয়ে লিখল— ‘মোর্শেদ’। তারপর দ্রুত হাতে সেটা মুছে ফেলল, যেন নিজের এই গোপন পাপটুকু সে কারো কাছে ধরা পড়তে দিতে চায় না। কিন্তু মনের ভেতরে সেই আদিম হাহাকারটা তখনো রয়ে গেল— কাল কি তবে সত্যি দেখা হবে? নাকি এই তৃষ্ণাটুকুই বুধবারের শেষ পাওনা?
বাথরুম থেকে বের হয়ে সামিনা সরাসরি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের টিমটিমে আলোয় আয়নার ভেতরে নিজেকে আজ একটু অন্যরকম লাগছে তার। আকাশী রঙের ওপর সাদা ফুল ছাপের হাফহাতা সুতির ম্যাক্সিটা তার ভরাট শরীরে টানটান হয়ে লেপ্টে আছে। ভেজা শরীরের ঘ্রাণ আর সাবানের মৃদু সুবাস ঘরটার গুমোট বাতাসকে একটু হালকা করে দিল।
সামিনা তার দুই হাত দিয়ে টাওয়ালটা শক্ত করে ধরে মাথাটা একটু পেছনের দিকে হেলিয়ে দিল। তারপর দ্রুত ছন্দে ভেজা চুলে বাড়ি দিয়ে দিয়ে ঝাড়তে শুরু করল। প্রতিটি ঝাঁকুনিতে তার নিতম্ব অবধি লম্বা, ঘন কালো চুলে উত্তাল ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সেই ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে তার শরীরের প্রতিটি রেখা যেন এক আদিম ছন্দে দুলছে। ম্যাক্সির পাতলা কাপড়ের নিচ দিয়ে তার বিশাল ভারী স্তনগুলো অবাধ্যভাবে দুলতে শুরু করল, যেন তারা মোর্শেদের সেই না-বলা কথাগুলোর উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে মুক্ত হতে চাইছে।
চুল ঝাড়ার এই ক্লান্তিকর কিন্তু ছন্দময় কাজটা করতে করতে সামিনার মনে হলো, এই মুহূর্তটা যদি মোর্শেদ দেখত? মোর্শেদ কি তার ওই অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে সামিনার এই ঘর্মাক্ত আড়ষ্টতা দেখে হাসত? নাকি তার সেই শক্ত হাত দুটো দিয়ে সামিনার এই ভিজে জবজবে চুলগুলো মুঠো করে ধরত?
সামিনা আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের মণি দুটো আজ অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল। সে ভাবতে লাগল, বনানীর সেই আভিজাত্যে ঘেরা মানুষটা কি কখনও কল্পনা করতে পেরেছে যে, ঢাকার এক সাধারণ ফ্ল্যাটের বন্ধ ঘরে এক স্কুল শিক্ষিকা কেবল তার কথা ভেবেই এভাবে নিজের শরীরের প্রতিটি কোষে কাঁপন ধরাচ্ছে?
সে টাওয়ালটা একপাশে সরিয়ে রেখে আবার চিরুনি হাতে নিল। ভেজা চুলগুলো যখন পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল, তখন সামিনার মনে হলো— এই দীর্ঘ চুলগুলো যেন এক একটা শিকল, যা তাকে মোর্শেদের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদ বলেছিল, ‘অভিনয়ের বিরতি দরকার’। সামিনা অনুভব করল, আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে কোনো অভিনয় করছে না। সে আজ কেবলই এক তৃষ্ণার্ত নারী, যে তার অদৃশ্য প্রেমিকের জন্য নিজের যৌবনকে সাজিয়ে রাখছে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে সামিনা ধীরপায়ে খাটের ওপর এসে গা এলিয়ে দিল। ভেজা চুলের ভার আর মনের ভেতরের অস্থিরতা তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। সে তার হেডফোনটা কানে গুঁজে দিয়ে ফোনে একটা গান প্লে করল— “জলে ভাসা পদ্ম আমি, শুধু পেলাম ছলনা...”
বিষণ্ণ কণ্ঠটা যখন কানের ভেতর দিয়ে মগজে গিয়ে আছড়ে পড়ল, সামিনা চোখ বন্ধ করল। গানের প্রতিটি শব্দ যেন তার নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেও তো আজ এক ছলনার জালে বন্দি পদ্ম হয়ে ভাসছে। মোর্শেদ কি তবে তাকে কেবলই দূরে সরিয়ে রাখছে? এই দীর্ঘ নীরবতা কি তবে কোনো এক বড় ভাঙনের সংকেত? এই ভাবতে ভাবতে এবং গানের সেই করুণ সুরের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে সামিনা কখন যে ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল, সে নিজেও জানল না। তার বালিশের একপাশে ফোনটা পড়ে রইল, যেখানে গানটা লুপে বেজেই চলেছে।
অপরদিকে, বনানীর সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে যখন দুপুরের কড়া রোদ জানালার ভারী পর্দা ভেদ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল, তখন মোর্শেদ সবে তার ঘুম ভাঙা চোখ মেলল। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও তার এই অনিয়মিত জীবনযাত্রা যেন তার একাকীত্বেরই এক পরিচয়। আজ সে ইচ্ছাকৃতভাবেই দেরি করে উঠেছে।
বিছানা ছেড়ে সে সরাসরি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তপ্ত রোদে শহরটা পুড়ছে, কিন্তু মোর্শেদের ভেতরে বইছে এক শীতল মনস্তাত্ত্বিক হাওয়া। সে আজ একবারও বাইক নিয়ে বের হওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। তার পরিবর্তে তার দিন কাটল এক অদ্ভুত নেশায়। সে সোফায় আধশোয়া হয়ে হাতে দামী লাইটার আর এক প্যাকেট মার্লবরো রেড নিয়ে বসল।
একের পর এক সিগারেট পুড়ছে আর অ্যাশট্রেতে ছাইয়ের পাহাড় জমছে। মোর্শেদের সমস্ত মনোযোগ এখন তার ফোনের গ্যালারিতে। সে স্ক্রল করে করে সামিনার আগে পাঠানো সেই ছবিগুলো দেখছে। সামিনার সেই বিষণ্ণ চোখ, চুলের রাশি আর তার শরীরের প্রতিটি ভরাট ভাঁজ— যা মোর্শেদকে বারবার অস্থির করে তুলছে।
পুরো ফ্ল্যাটটা এখন দামী তামাকের কড়া গন্ধে মজে আছে। এসির হিমেল বাতাস সেই ধোঁয়াকে কুণ্ডলী পাকিয়ে কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। মোর্শেদ তার আরামকেদারায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘষছে। প্রতিটি ছবিতে সামিনা যেন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে তার চোখে। কোনো ছবিতে সামিনা হয়তো অন্যমনস্ক হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কোনোটিতে তার সেই চিরচেনা বিষণ্ণ মায়া।
মোর্শেদের নজর আটকে গেল সামিনার একটা পুরনো ছবিতে— যেখানে সে মেরুন রঙের একটা কামিজ পরে ছিল। ওড়নাটা কাঁধ থেকে কিছুটা সরে গিয়ে সামিনার ভরাট শরীরের বাঁকগুলোকে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক রূপ দিয়েছে। মোর্শেদ ছবিটা জুম করল। সামিনার গলার হাড়ের কাছে জমে থাকা এক বিন্দু ঘাম যেন স্ক্রিন ফুঁড়ে মোর্শেদের তৃষ্ণাকে উস্কে দিচ্ছে। সে একটা লম্বা টান দিল সিগারেটে। ছাইটা অ্যাশট্রেতে ফেলতে গিয়ে দেখল, সেখানে আর জায়গা নেই। এক দিনে তিন প্যাকেট শেষ।
মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, “তুমি জানো না সামিনা, এই নীরবতা আসলে আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। তোমাকে ক্ষুধার্ত রাখলে তবেই না তুমি কাল আমার ওই মেটিয়রের পেছনে বসবে।”
সে ছবিগুলো থেকে চোখ সরিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। তার অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক এখন কালকের ছক কষছে। সামিনার সেই ‘না’ বলার দেওয়ালগুলো সে আজ সারাদিন একটা মেসেজও না দিয়ে প্রায় ধসিয়ে দিয়েছে। সে জানে, ওপাশে সামিনা এখন একটা ‘জলে ভাসা পদ্ম’র মতোই অসহায়।
কিন্তু পরক্ষণেই মোর্শেদের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতায় হাহাকার করে উঠল। সে কি আসলেও বিজয়ী? নাকি এই ইঁদুর-বেড়াল খেলায় সে নিজেও আজ ভীষণভাবে পরাজিত? সে সামিনাকে অস্থির করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে সেই অস্থিরতার বিষাক্ত নীল রঙ এখন তার নিজের সত্ত্বাকেই গ্রাস করছে। সে অনুভব করল, সামিনাকে এক মুহূর্ত না দেখে বা তার সাথে কথা না বলে থাকাটা তার পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার কাছে এক চরম অবমাননা। তার সমগ্র শরীর আর সত্ত্বা যেন সামিনার সেই ভরাট উপস্থিতি আর বিষণ্ণ মায়ার জন্য হাহাকার করছে। সে কি তবে নিজেই নিজের পাতা জালে আটকা পড়ে গেল?
দুপুরে লাঞ্চের টেবিলে খাবারগুলো বিস্বাদ ঠেকল তার কাছে। এক লোকমা মুখে তুলেই সে সরিয়ে রাখল। আর থাকা সম্ভব নয়। এই চার দেয়ালের আভিজাত্য এখন তার কাছে জেলখানার মতো মনে হচ্ছে। মোর্শেদ দ্রুত উঠে তার রাইডিং জ্যাকেটটা টেনে নিল। আলমারি থেকে বের করল তার সেই প্রিয় গ্লাভস জোড়া।
নিচে নেমে রয়্যাল এনফিল্ডের কভারটা যখন সে সরাল, মেটিয়রের কালো মেটালটা যেন তাকে দেখে বিদ্রূপের হাসি হাসল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই সেই পরিচিত ভরাট গুমগুম শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু আজ কোনো গন্তব্য নেই।
মোর্শেদ বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঢাকার তপ্ত রাস্তায়। কড়া রোদ তাকে স্পর্শ করতে পারল না, কারণ তার মনের ভেতরের আগুন তখন বাইরের রোদের চেয়েও প্রখর। বনানী থেকে তেজগাঁও, সেখান থেকে সাতরাস্তা হয়ে সে ছুটে চলল অন্তহীন এক ঘোরের মধ্যে। ট্রাফিক সিগন্যাল, মানুষের ভিড়, বাসের কালো ধোঁয়া—সবকিছু তার পাশ দিয়ে ঝাপসা হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তার কানে কেবল বাজছে সামিনার সেই আধো-লাজুক কন্ঠস্বর।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোগুলো জ্বলে উঠল, কিন্তু মোর্শেদের রাইডিং শেষ হলো না। সে ঢাকার এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কখনও হাতিরঝিলের ফ্লাইওভারে বাতাসের ঝাপটা নিচ্ছে, কখনও আবার নির্জন কোনো গলিতে বাইকের গতি কমিয়ে সামিনার সেই ছবিগুলোর কথা ভাবছে। এই ছুটে চলার তীব্র অনুভূতিই যেন তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, সে আসলে সামিনার মায়ার কাছে কতটা নিরুপায়। এই শহর, এই বাইক, এই গতি—সবই যেন আজ সামিনা নামের এক গোলকধাঁধায় গিয়ে মিলেছে।
রাত এগারোটা। বনানীর ফ্ল্যাটে যখন মোর্শেদ ফিরল, তখন তার শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু মস্তিষ্কটা তখনও সেই ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনের মতোই তপ্ত। হেলমেটটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে গ্লাভসগুলো খুলল। সারা শহর ঘুরেও সে আসলে নিজের ভেতরের অস্থিরতা থেকে পালাতে পারেনি।
এসিটা চালিয়ে সে অন্ধকার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ড্রিংকস বানানোর কোনো ইচ্ছে আজ তার নেই, এমনকি সিগারেটের ধোঁয়াও এখন তেতো লাগছে। সে ফোনের নেটটা অন করতেই নোটিফিকেশনের বন্যায় স্ক্রিনটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে সে সরাসরি নিজের প্রোফাইলে গিয়ে একটা স্ট্যাটাস লিখল—
“শহরজুড়ে হাজার হাজার ল্যাম্পপোস্টের আলো, অথচ গন্তব্যের রাস্তাটা আজ বড় বেশি ঝাপসা। গতির নেশায় নিজেকে হারাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রতিটা মোড়েই দেখি এক জোড়া বিষণ্ণ চোখের মায়া আটকে আছে।”
স্ট্যাটাসটা পোস্ট করার ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত টিং শব্দটা বেজে উঠল। সামিনা। মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। শিকারী হয়তো জাল পেতেছিল, কিন্তু বন্দিনী নিজেই এখন জালের সুতো ধরে টান দিচ্ছে।
সে ইনবক্স খুলল।
“সারাদিন কোথায় ছিলেন?”
এই একটা ছোট্ট প্রশ্ন। কিন্তু এই তিনটি শব্দের ভারে সারাদিনের সেই ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ আলফা মোর্শেদ এক নিমেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। যে মানুষটা একটু আগে পর্যন্ত নিজেকে এক অভিজ্ঞ শিকারী ভাবছিল, যে ভেবেছিল নীরবতা দিয়ে সে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে— সে এখন এক লহমায় খুব অসহায় হয়ে পড়ল।
এই প্রশ্নের ভেতরে কী ছিল না? শাসনের এক অদ্ভুত মায়া, গভীর উদ্বেগ, অবদমিত কামনা, আর এক আকাশ সমান অভিমান। ঠিক যেভাবে একজন রাগান্বিত মা তার অবাধ্য সন্তানকে শাসন করে, কিংবা একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্ত্রী তার দেরিতে ফেরা স্বামীর পথ চেয়ে বসে থাকে— সামিনার এই প্রশ্নে সেই সবটুকু আবেগ মিশে ছিল।
মোর্শেদের বুকের ভেতরটা এক নিদারুণ মোচড় দিয়ে উঠল। তার সমস্ত আভিজাত্য, তার সেই ৩৫০ সিসির গতির দম্ভ— সবকিছু যেন এই প্রশ্নটার কাছে নতজানু হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “সামিনা... তুমি কি তবে সত্যি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে?” সে অনুভব করল, এই শহরে তাকে খোঁজার মতো কেউ ছিল না বলেই সে আজীবন গতির পেছনে ছুটেছে। কিন্তু আজ, ঢাকার অন্য এক কোণে এক শান্ত স্বভাবের নারী কেবল তার হদিস না পেয়ে তিলে তিলে দগ্ধ হয়েছে। এই প্রাপ্তিটুকু মোর্শেদকে মুহূর্তের মধ্যে অবশ করে দিল। সে কাঁপাকাঁপা আঙুলে টাইপ করতে শুরু করল, কিন্তু বারবার কেটে দিচ্ছে। তার মতো তুখোড় বক্তা আজ কোনো জুতসই শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।
অবশেষে সে শুধু লিখল—
মোর্শেদ: “আমি হেরে গেছি সামিনা। তোমার এই একটা প্রশ্নের কাছে আমি আমার সারাদিনের সব জেদ আর অহংকার হেরে গেছি। বিশ্বাস করো, আমি এই নরককুণ্ডে কেবল তোমার জন্যই ফিরে এসেছি।”
সামিনা: (তৎক্ষণাৎ উত্তর এল) “হারানোর জন্য কি আমাকেই পেলেন? আপনি কি জানেন আজ আমার প্রতিটা সেকেন্ড কিভাবে কেটেছে? আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি আপনার কাছে স্রেফ একটা খেলনা।”
মোর্শেদ: “খেলনা নও সামিনা, তুমি আমার অস্তিত্বের এমন এক টান যা আমি অস্বীকার করতে চেয়েও পারিনি। কাল বৃহস্পতিবার। আমি আসব। তোমার সব অভিমান নিজের হাতে মুছে দিতে আসব। আজ রাতে আর কোনো কথা নয়, শুধু এই টুকু জেনে রাখো— মোর্শেদ আজ প্রথমবার কারো কাছে ধরা দিল।”
মোর্শেদের ওই একটি স্বীকারোক্তি— "মোর্শেদ আজ প্রথমবার কারো কাছে ধরা দিল"— সামিনার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল। সে বালিশে মাথা রেখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্ধকার ঘরে শুধু ফোনের নীল আলোটা তার মুখে এসে পড়ছে।
সামিনা: “মোর্শেদ আজ প্রথমবার কারো কাছে ধরা দিল— কথাটা খুব ভারী শোনায়। আপনি কি জানেন আপনি কার কাছে ধরা দিয়েছেন? আমি তো সামান্য এক স্কুল শিক্ষিকা, যার জগৎটা শুধু ঘর আর স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডের মাঝখানে বন্দি। আপনার মতো আকাশছোঁয়া মানুষের এই পতন কি মানায়?”
মোর্শেদ: “পতন নয় সামিনা, এটাকে বলে শিকড়ে ফেরা। আজ সারাটা দিন যখন বাইক নিয়ে ঢাকার ধুলো উড়িয়েছি, তখন প্রতিটা মোড়ে মনে হচ্ছিল— কেন আমি ছুটছি? কার জন্য এই গতি? দিনশেষে যখন তোমার ওই ইনবক্সের প্রশ্নটা দেখলাম, তখন মনে হলো আমার এই ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনটা আসলে তোমার ওই একটা প্রশ্নের কাছে গিয়েই থেমেছে। তুমি সামান্য নও সামিনা, তুমি একটা স্থির নদী, যার টানে সমুদ্রও মাঝে মাঝে দিক হারায়।”
সামিনা: “আপনি খুব গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারেন। অথচ আপনার এই মিথ্যেগুলোই আমার কাছে সবচেয়ে সত্যি মনে হয়। আমি নিজেকে খুব নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলাম আজ। ভেবেছিলাম, আপনি মেসেজ দিলেও আমি উত্তর দেব না। কিন্তু আপনার ওই নীরবতা আমাকে ভেতরে ভেতরে এমনভাবে পুড়িয়েছে যে, আমি নিজেই নিজের শাসন ভুলে গিয়ে আপনার খোঁজ নিলাম। এটা কি আমার পরাজয়?”
মোর্শেদ: “না সামিনা, এটা পরাজয় নয়। এটা হলো একজনের একাকীত্বের ইকোসিস্টেমে অন্যজনের নিঃশ্বাস হয়ে ঢুকে পড়া। তুমি জানো? আজ তোমার ওই ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিল— ছবির ওই বিষণ্ণতাটুকু যদি আমি ছুঁতে পারতাম! আমি চাইলেই তো তোমাকে হাজারটা প্রশ্ন করতে পারতাম, কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছিলাম। যদি শব্দের আঘাতে তোমার ওই মায়াবী নীরবতা ভেঙে যায়?”
সামিনা: “ভয় তো আমারও লাগে। ভয় হয় এই ভেবে যে, আপনি যখন আমাকে ‘তুমি’ করে বলেন, তখন আমার ভেতরের সামিনাটা যেন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। আপনি যখন বলেন ‘অভিনয়ের বিরতি দরকার’, তখন আমার মনে হয় আমি যেন এক জন্ম ধরে শুধু অভিনয়ই করে এসেছি। আপনার এই শব্দের মায়া কি আমায় কোনোদিন মুক্তি দেবে না?”
মোর্শেদ: “মুক্তি কি তুমি আসলেও চাও? নাকি এই বন্দিত্বেই তুমি এক ধরণের প্রশান্তি পাচ্ছ? দেখো সামিনা, আমাদের এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই, কোনো গন্তব্য নেই। আছে শুধু এই মাঝরাতের কিছু হাহাকার আর একে অপরকে অনুভব করার এক আদিম আকুলতা। তুমি কি ওপাশে বসে অনুভব করতে পারছ না— আমার এই নীরব দীর্ঘশ্বাসগুলো তোমার ঘরের পর্দায় গিয়ে আছড়ে পড়ছে?”
সামিনা: “পারছি। আজ রাতে এই এসি-র ঠান্ডার চেয়েও আপনার কথার উত্তাপ আমাকে বেশি ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না কাল কী হবে, কিংবা আমাদের শেষ কোথায়। শুধু এইটুকু জানি, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে আমি প্রথমবার অনুভব করছি— কারো জন্য অপেক্ষা করার মধ্যেও এক ধরণের স্বর্গীয় যন্ত্রণা আছে।”
মোর্শেদ: “যন্ত্রণাটুকু থাক সামিনা। এই যন্ত্রণাটুকুই আমাদের জীবন্ত করে রাখে। আজ আর কোনো কথা নয়। শুধু এইটুকু জেনে রাখো— বনানীর এই অন্ধকারে কেউ একজন তোমার কাজল ধোয়া চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তুমি ঘুমানোর চেষ্টা করো। তোমার ঘুমের ঘোরেও যেন আমার এই কন্ঠস্বরটা অনুরণিত হয়।”
সামিনা: “শুভরাত্রি মোর্শেদ। আপনিও ঘুমিয়ে পড়ুন। আজ রাতটা খুব বেশি মায়াবী হয়ে যাচ্ছে।”
সামিনা ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল। সে কোনো গন্তব্য চাইল না, কোনো প্রতিশ্রুতি চাইল না। শুধু এইটুকু অনুভব করল যে, এই বিশাল শহরে তার একাকীত্বের সঙ্গী হিসেবে একজন মোর্শেদ আছে।
বুধবারে যে অস্থিরতা ছিল বিষাদমাখা, বৃহস্পতিবারের সেই একই অস্থিরতা যেন এক রঙিন প্রজাপতি হয়ে সামিনার মনে ডানা ঝাপটাতে লাগল। সকাল থেকেই তার সমস্ত মনোযোগ কেবল একটা অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটার দিকে। স্কুলে ক্লাস নেওয়ার সময় সে বারবার নিজের অজান্তেই জানালার ওপাশে আকাশের নীল রং দেখছিল।
দুজনেই দুজনের সময়ের একটা অলিখিত ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সামিনা জানে, মোর্শেদ এখন তাকে বিরক্ত করবে না; আর মোর্শেদ জানে, চারটের পর সামিনা তার একান্ত নিজের। এই যে একে অপরের রুটিনকে নিঃশব্দে চিনে নেওয়া—এটাও যেন এক ধরণের অদৃশ্য মায়ার সুতো।
স্কুল ছুটি হতেই সামিনা দ্রুত বাসায় ফেরার জন্য রিকশা নিল। প্রতিদিন জ্যামে বসে মেজাজ খিটখিটে হলেও আজ তার মোটেও বিরক্তি লাগছে না। বাসায় ঢোকার পর মায়ের সাথে দু-একটা দায়সারা কথা বলে সে দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল। কোনোমতে কয়েক লোকমা খেয়েই সে হাতমুখ ধুয়ে সতেজ হয়ে নিল। মনের ভেতর তখন ঢাকের শব্দ বাজছে।
বিকেল চারটে বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগে সামিনা ফোনটা হাতে নিল। বুকের ভেতর এক ধরণের তীব্র কম্পন অনুভব করছে সে। মেসেঞ্জারে গিয়ে ছোট করে টাইপ করল—
সামিনা: “আমি ফিরেছি। বাসায় এখন একাই আছি রুমে।”
মেসেজটা ‘সিন’ হওয়ার জন্য তাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মোর্শেদ অনলাইনে আগে থেকেই ছিল, যেন সেও এই সংকেতটার জন্যই ওপাশে বসে প্রহর গুনছিল।
মোর্শেদ: “আমি জাস্ট একটা কাজ শেষ করছি। ঠিক দশ মিনিট পর আমি ফোন দিচ্ছি তোমাকে।”
সামিনা ফোনটা পাশে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার গাল দুটো কেন জানি আজ একটু বেশিই লাল হয়ে আছে। সে অপেক্ষা করতে লাগল। দশ মিনিট সময়টা যেন দশ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। ঠিক দশম মিনিট মাথায় ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। মোর্শেদের সেই চিরচেনা গম্ভীর নামটা ভেসে উঠেছে। সামিনা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কলটা রিসিভ করল।
ফোনের ওপাশে মোর্শেদের গলার স্বরটা আসতেই সামিনা যেন এক মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গেল। মোর্শেদের গলার সেই ভরাট টেক্সচার, যা কিছুটা রুক্ষ অথচ ভীষণ আপন।
মোর্শেদ: "উফ্, এই দশটা মিনিট মনে হচ্ছিল কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে অনন্তকাল ধরে আটকে আছি। কী করছো ম্যাডাম? স্কুলের ডাস্ট আর ব্ল্যাকবোর্ডের চকের গুঁড়ো কি সব ঝেড়ে ফেলেছো শরীর থেকে?"
সামিনা: (একটু হেসে) "আপনার কি ধারণা আমি স্কুলে শুধু ব্ল্যাকবোর্ডই মুছি? আজ তো বাচ্চাদের পড়া ধরতে গিয়ে তিনবার আপনার কথা মনে করে ভুল করে ফেলেছি। তার ওপর বাসায় ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল আজকের রোদটা যেন আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।"
মোর্শেদ: "রোদের দোষ দিয়ে লাভ নেই সামিনা। ওটা আসলে কাল রাতের সেই কথোপকথনের রেশ। তবে আমি কিন্তু অফিসে আজ খুব লক্ষ্মী ছেলে হয়ে ছিলাম। কলিগরা জিজ্ঞেস করছিল—মোর্শেদ ভাই, আজ কি কোনো বড় ডিল ক্লোজ হচ্ছে নাকি? আপনার মুখে তো বিজয়ীর হাসি!"
সামিনা: "মিথ্যেবাদী! আপনি যে কী পরিমাণ অভিনয় করতে পারেন, তা আমার জানা হয়ে গেছে। আচ্ছা, আজ দুপুরের লাঞ্চে কী খেয়েছেন? আপনার তো আবার দামী রেস্টুরেন্ট ছাড়া গলা দিয়ে কিছু নামে না।"
মোর্শেদ: "আজ কিন্তু একদম উল্টো। তোমার কথা ভাবতে ভাবতে অফিসের ক্যাফেটেরিয়ার সেই বিস্বাদ স্যান্ডউইচটাই অমৃত মনে হয়েছে। তবে খেতে খেতে হঠাৎ মনে পড়ছিল আমাদের সেই টঙ্গী যাত্রার কথা। মনে আছে?
সামিনা: (লাজুক হেসে) "উফ্, মনে করাবেন না ওসব। আমার এখনো মনে আছে, আপনি যখন বাইকটা সেই অন্ধকার রাস্তায় ঝড়ের বেগে চালাচ্ছিলেন, আমি তখন চোখ বন্ধ করে কার কার নাম জপ করছিলাম আপনি জানেন না। আমার তো মনে হচ্ছিল আপনি আমার হাড়গোড় আস্ত রাখবেন না।"
মোর্শেদ: "আরে না! ওটা তো ছিল মেটিয়রের আসল ক্যারেক্টার। তুমি তো ভয়ে আমার জ্যাকেটটা এমনভাবে জাপ্টে ধরেছিলে, যেন আমি কোনো বড়সড় চোর আর তুমি আমাকে পাহারা দিচ্ছ। সত্যি বলো তো, সেদিন কি আসলেও খুব ভয় পেয়েছিলে? নাকি আমাকে ধরার একটা অজুহাত খুঁজছিলে?"
সামিনা: "অসভ্য! আপনার স্পর্ধা তো কম না! আমি ভয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম আর আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে ধরার অজুহাত খুঁজছিলাম? তবে..."
মোর্শেদ: "তবে কী? থেমে গেলে কেন?"
সামিনা: (গলাটা একটু খাদে নামিয়ে) "তবে ওই বাতাসের ঝাপটা আর আপনার ওই জ্যাকেটের গন্ধটা... কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘোরের মতো ছিল। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই রাস্তাটা যদি শেষ না হতো, তবে হয়তো ভালোই হতো।"
মোর্শেদ: (মৃদু স্বরে) "রাস্তা তো শেষ হয় না সামিনা, আমরা আসলে গন্তব্য খুঁজে থামতে চাই। কাল রাতে তুমি যখন জিজ্ঞেস করলে— সারাদিন কোথায় ছিলেন? বিশ্বাস করো, আমার মনে হচ্ছিল আমি বুঝি আমার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। তোমার ওই শাসনের মধ্যে যে দাবি ছিল, সেটা আমার কয়েক কোটি টাকার ডিলের চেয়েও বেশি দামী।"
সামিনা: "বেশি আবেগ দেখাবেন না তো! আপনি তো কাল রাতে আমাকে কাঁদিয়েছেন। আজ অন্তত একটু হাসতে দিন। আচ্ছা, আপনি কি এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন?"
মোর্শেদ: "না, এখন শুধু তোমার কন্ঠস্বরটা গিলছি। আজ সিগারেটের ধোঁয়া তোমার গলার স্বরের চেয়ে বেশি নেশা ধরছে না। তোমার ওই একঘেয়ে স্কুল জীবনের গল্পগুলো বলো না শুনি, আজ আমি খুব মন দিয়ে তোমার সাধারণ দিনলিপি শুনতে চাই।"
সামিনা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে বলতে লাগল তার ছোটখাটো সব কথা—কোন ছাত্রীটা আজ পড়া পারেনি, মা আজ কী রান্না করেছে, আর রিকশায় বসে সে মোর্শেদের কথা ভেবে কীভাবে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। তাদের কথার পিঠে কথা জমছে, যেন এক জন্ম ধরে তারা একে অপরের জন্য এই কথাগুলো জমিয়ে রেখেছিল।
ফোনের ওপাশে মোর্শেদের গলার স্বরটা হঠাতই একটু খাদে নেমে এল। হাসাহাসির মাঝখানে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে দুজনেই মধ্যে। মোর্শেদ জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বিকেলের মরা রোদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মোর্শেদ: “শোনো সামিনা, অনেক তো হলো ফোনের ওপাশে বসে খুনসুটি। সেদিন টঙ্গী নিয়ে গিয়েছিলাম হুট করে, ওটা আসলে কোনো গোছানো ব্যাপার ছিল না। আমি চাচ্ছি কাল শুক্রবার বিকেলে তোমাকে একটা ‘অফিশিয়াল ডেট’-এ নিয়ে যেতে। একদম প্রপার একটা ডেট। আসবে আমার সাথে?”
সামিনা বুকের ভেতর একটা ধাক্কা অনুভব করল। সে বিছানা থেকে উঠে বসে নিজের ওড়নাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে একটু কৌতুক মেশানো স্বরে বলল—
সামিনা: “অফিশিয়াল ডেট? মানে কী? ডেট তো সাধারণত প্রেমিক-প্রেমিকারা করে। আমাদের কি তেমন কোনো পরিচয় আছে? আমরা কি সেই পর্যায়ের কিছু যে ‘ডেট’-এ যেতে হবে?”
মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) “পরিচয় কি সব সময় শুরুতেই স্ট্যাম্প দিয়ে হতে হয়? আচ্ছা, তোমার ওই সংজ্ঞায় যদি আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা না-ও হই, তবে ক্ষতি কী? চলো না, কাল বিকেলে ডেট করতে করতে না হয় আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে যাই। কোনো একটা সম্পর্ক তো শুরু করতে হবে, তাই না?”
সামিনা: “আপনি বড় ভয়ানক মানুষ! একদম সোজা সাপ্টা কথা বলে মানুষকে অপ্রস্তুতে ফেলে দেন। আমি ভাবলাম আপনি হয়তো বলবেন— না না, ফ্রেন্ডলি হ্যাংআউট। আর আপনি তো দেখি একদম সিলমোহর মেরে দিচ্ছেন!”
মোর্শেদ: “ফ্রেন্ডলি হ্যাংআউট করার মতো বয়স বা ধৈর্য কোনোডাই আমার নেই সামিনা। আমি তোমাকে নিয়ে বের হতে চাই কারণ তোমাকে আমার পাশে দেখতে আমার ভালো লাগে। তোমার ওই শান্ত চেহারার পাশে আমার এই রুক্ষতাটা বেশ মানিয়ে যায়। তো, কাল বিকেল চারটেয় কি আমি মেটিয়র নিয়ে তোমার গলির মোড়ে থাকব?”
সামিনা ফোনের ওপাশে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার বুকটা ধক ধক করছে, যেন এক কিশোরী প্রথমবার কেউ তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পর যে রকম কাঁপন অনুভব করে। সে দোটানায় পড়ার একটা মৃদু ভান করল, নিজের ওড়নার খুঁটটা আঙুলে বারবার প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল—
সামিনা: “বিকেল চারটে? এতো তাড়াতাড়ি? মা আবার কী ভাববে কে জানে। আর শুক্রবার তো বাসায় মেহমান আসার কথা থাকতে পারে। আপনি বড্ড হুটহাট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন।”
মোর্শেদ: (চাপা হাসির স্বরে) “মেহমানদের কাল ছুটি দিয়ে দাও সামিনা। আর দোটানা রেখে লাভ নেই। আমি জানি তোমার ভেতরের সেই অবাধ্য মেয়েটা এখন ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হচ্ছে। শুধু শুধু নাখুর নুখুর করে সময় নষ্ট কোরো না।”
সামিনা: “উফ্, আপনি খুব জেদি! আচ্ছা ঠিক আছে, আসব। কিন্তু একদম গলির মুখে দাঁড়াবেন না, একটু দূরে পপুলারের সামনে থাকবেন। আমি চারটের মধ্যেই চলে আসব। তবে বেশিক্ষণ কিন্তু থাকা যাবে না, সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে।”
মুখে ‘সন্ধ্যার আগে ফিরব’ বললেও সামিনার মনের ভেতর তখন খুশির এক বিশাল ফোয়ারা ছুটছে। এই দিনটার জন্য, এই একটা প্রস্তাবের জন্য সে যেন গত কয়েক বছর ধরে একঘেয়ে জীবনের ঘানি টেনেছে। ফোনের ওপাশে মোর্শেদের সম্মতিসূচক এক গভীর ‘হুম’ শুনে সে সংযোগটা কেটে দিল।
ফোনের সংযোগটা কেটে দেওয়ার পর মোর্শেদ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। তার ভেতরে এখন এক ধরণের অস্থির তৎপরতা কাজ করছে। আলমারি থেকে রাইডিং গ্লাভস জোড়া টেনে নিয়ে সে দ্রুত নিচে নেমে এল। বনানীর পার্কিং লটে রাখা রয়্যাল এনফিল্ড মেটিয়রের দিকে তাকিয়ে সে একবার মনে মনে হাসল।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই সেই পরিচিত গম্ভীর আওয়াজটা গ্যারেজে প্রতিধ্বনি তুলল। সে বাইক নিয়ে সোজা রওনা হলো মোহাম্মদপুরের দিকে। হারুনের দোকানের সামনে যখন সে পৌঁছাল, তখন বিকেলের শেষ আলোটা ঢাকার ধুলোমাখা রাস্তায় এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়েছে।
মেটিয়রটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে মোর্শেদ হেলমেট খুলল। হারুন তখন অন্য একটা বাইকের চেইন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। মোর্শেদকে দেখেই সে কাজ রেখে এগিয়ে এল।
মোর্শেদ: “হারুন, এই ধর মার্লবরো। আগে একটা ধরা। তারপর আমার বাইকটা নিয়ে বোস। চেইনটা লুব করবি, ব্রেক আর ক্লাচ একদম নিখুঁত অ্যাডজাস্ট করবি। কাল অনেক দূরে যাব, কোনো খুত থাকা চলবে না।”
হারুন দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, “বুঝছি মোর্শেদ ভাই। কাল কি তলে তলে কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি? বাইক তো একদম চকচক করতাছে।”
মোর্শেদ উত্তর দিল না। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বাইকের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই প্রথম রাইডের কথা। টঙ্গী যাওয়ার সময় আয়নায় দেখা সেই দৃশ্যটা—সামিনা যখন তার পেছনে বসল, তার সেই বিশাল ভরাট নিতম্ব মেটিয়রের ছোট পিলিয়ন সিটটাতে ঠিকঠাক ধরছিল না। সামিনা আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল, তার সেই শারীরিক গঠন আর বাইকের সিটের অসমতা মোর্শেদের চোখে এক চরম এরোটিক দৃশ্য তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু সে বুঝতে পেরেছিল সামিনা খুব কষ্ট পাচ্ছে।
মোর্শেদ সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে হারুনকে ডাকল।
মোর্শেদ: “শোন হারুন, এই ব্যাকসিটটা এখনই খোল। আমার স্টোরে একটা এক্সটেনডেড ওয়াইড পিলিয়ন সিট রাখা ছিল না? ওইটা নিয়ে আয়। কালকের রাইডে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। পেছনের সিটটা যেন একদম আরামদায়ক আর চওড়া হয়।”
হারুন অবাক হয়ে তাকাল। মেটিয়রের মতো বাইকে সাধারণত কেউ হুট করে চওড়া সিট লাগাতে চায় না লুক নষ্ট হবে বলে। কিন্তু মোর্শেদের চোখের ভাষা সে চেনে। সে দ্রুত স্টোর থেকে সেই চওড়া কুশন সিটটা নিয়ে এল।
সিটটা লাগানোর সময় মোর্শেদের মনে একটা অদ্ভুত সুরসুরি খেলে গেল। সে কল্পনা করতে পারছে, কাল এই প্রশস্ত সিটে সামিনা যখন তার বিশাল লাবণ্য নিয়ে বসবে, তখন সে আর আগের মতো আড়ষ্ট থাকবে না। সে আরাম করে বসবে, আর মোর্শেদের পিঠের ওপর নিজের শরীরটা ছেড়ে দেবে। সামিনার এই ‘কষ্ট’টুকু সে লাঘব করতে চায়, কারণ কালকের দিনটা হবে শুধু উপভোগের।
বাইকের সিট লাগানো শেষ করে মোর্শেদ একবার হাত দিয়ে সিটের নরম কুশনটা অনুভব করল। মনে মনে ভাবল— “কালকের বিকেলটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ হয়ে থাকবে সামিনা। তুমি ভাবতেও পারোনি আমি তোমার ওই অস্বস্তিটুকুও মনে রেখেছি।”
হারুনের দোকানে যখন বাইকের কাজ চলছে, ওদিকে সামিনার ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা যেন আজ এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে সামিনা তার আলমারির পাল্লাটা হাট করে খুলে ধরল।
শাড়ির ভাঁজগুলো একটা একটা করে নামাতে লাগল সে। কোনটা পরবে? মেরুন রঙের জামদানিটা? নাকি সেই আসমানি রঙের শিফনটা, যেটা পরলে তাকে অনেকটা মেঘের মতো লাগে? সামিনা একেকটা শাড়ি নিজের শরীরের ওপর ধরে আয়নায় দেখছে। আজ তার বিচারবুদ্ধি ঠিক কাজ করছে না। যে মানুষটা বাইকের সিট বদলে ফেলার মতো সূক্ষ্ম ডিটেইল নিয়ে ভাবছে, তার সামনে নিজেকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করার এক অদ্ভুত দায়বদ্ধতা সে অনুভব করছে।
সে বিছানার ওপর শাড়ি, ব্লাউজ আর ম্যাচিং অন্তর্বাসগুলো সাজিয়ে রাখল। হাত দিয়ে শাড়ির জমিনটা অনুভব করতে করতে সে এক ধরণের ঘোরের মধ্যে চলে গেল। কাল যখন সে মোর্শেদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, মোর্শেদ কি তার ওই অভিজ্ঞ চোখে প্রথম দেখাতেই সামিনাকে পড়ে ফেলবে? সামিনা কল্পনা করল, মোর্শেদের সেই গভীর দৃষ্টি তার কপালে থাকা টিপ আর ঘাড়ের কাছে আলগা হয়ে থাকা চুলের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে।
সে তার ড্রয়ার থেকে একটা নতুন কাজলের কৌটা বের করল। কাল সে চোখ জোড়াকে একটু বেশিই গভীর করে সাজাবে। যে চোখ দেখে মোর্শেদ বারবার দিক হারায়, সেই চোখে সে কাল মোহিনী মায়া মাখাবে। গয়নার বক্সটা খুলে সে তার প্রিয় রুপোর ঝুমকো জোড়া বের করে কানের পাশে ধরল। আয়নাই আজ তার একমাত্র সখী।
সামিনা আলতো করে নিজের পেটে আর কোমরে হাত বোলালো। তার শরীরের ভরাট গঠন নিয়ে সে সব সময় একটু হীনম্মন্যতায় ভুগত, কিন্তু মোর্শেদের সেই রাতের কথাগুলো— "তোমার ওই রুক্ষতা আমার পাশে মানিয়ে যায়"— তাকে এক অন্যরকম আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সে ভাবল, কাল যখন সে মোর্শেদের বাইকের সেই নতুন প্রশস্ত সিটে বসবে, মোর্শেদের পিঠে হাত রাখবে, তখন কি শহরের বাতাস তাদের এই গোপন অভিসারের সাক্ষী থাকবে?
রাত বাড়ছে, কিন্তু সামিনার চোখে ঘুম নেই। সে শাড়িগুলো আবার ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখল, যেন কালকের প্রস্তুতির এই সামান্য খুঁতটুকুও মোর্শেদের চোখে ধরা না পড়ে। তার সারা শরীরে এখন শুক্রবার বিকেলের সেই আসন্ন রোমাঞ্চের শিহরন।
রাত গভীর হয়েছে। পুরো ঢাকা শহর যখন ঝিমিয়ে পড়েছে, সামিনা তখন বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণি দেখছিল। তার সমস্ত চিন্তাজুড়ে কালকের সেই চারটে বেজে এক মিনিট। ঠিক তখনই তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। মোর্শেদের মেসেজ।
মোর্শেদ: "হারুনের দোকান থেকে ফিরলাম। বাইকটা একদম তোমার মনের মতো করে সাজিয়ে এনেছি। কাল বিকেল চারটেয় কিন্তু ঠিক চারটেই। দেরি করে মেটিয়রকে আর আমাকে—কাউকেই রাগিয়ে দিও না যেন।"
সামিনা একটা মুচকি হাসি চেপে টাইপ করল—
সামিনা: "বাইক সাজানোর কী আছে? আর আমি তো বলেছিই চারটেয় আসব। এতো তাড়াহুড়ো কিসের?"
কয়েক সেকেন্ড পর মোর্শেদের পাল্টা মেসেজ এল—
মোর্শেদ: "তাড়াহুড়ো আছে সামিনা। কাল আমাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটা বিচার হতে হবে। তোমার চুলের গন্ধ আর মেটিয়রের ইঞ্জিনের আওয়াজ—দুটো একসাথে মিশিয়ে কাল আমি শহর ছাড়তে চাই। এখন ঘুমাও, কালকের জন্য কিছুটা এনার্জি বাঁচিয়ে রাখা দরকার।"
সামিনার বুকটা আবার সেই চেনা ছন্দে ধড়ফড় করে উঠল। সে আর কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদের ওই একটা মেসেজ—"তোমার চুলের গন্ধ"—সামিনাকে যেন এখনই কালকের সেই বিকেলটাতে নিয়ে গেল।
ওদিকে মোর্শেদ তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেষ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে টিপে নিভালো। সে জানে, কালকের পর সামিনা আর আগের মতো থাকতে পারবে না। সে তাকে এমন এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাবে, যা থেকে ফেরার কোনো মানচিত্র সামিনার জানা নেই।