পর্ব ৯ শব্দজালে নীল অনুরাগ
ভোরের অস্ফুট আলোটা যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর আসার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই টেবিলে রাখা ফোনটা তীক্ষ্ণ সুরে চিৎকার করে উঠল। সামিনার ঘুমটা খুব পাতলা, অ্যালার্মের প্রথম সুরেই তার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। হাতড়ে ফোনটা বন্ধ করে সে কিছুক্ষণ নিথর হয়ে শুয়ে রইল। ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা ৪৫ মিনিট। সামিনার শরীরটা আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই ভারী মনে হচ্ছে। একটা আড়মোড়া দিতে গিয়ে সে অনুভব করল তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অদ্ভুত শিরশিরানি। কালকের সেই বৃষ্টির মতো শাওয়ার, পানির অবিরাম ধারা আর নিজের শরীরের ওপর নিজেরই অবাধ্য হাতের সেই মর্দন—সবকিছু যেন একটা ঘোরের মতো তার মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ছে। বিছানার চাদরের ঘর্ষণেও সে আজ কেমন শিহরিত হচ্ছে। কালকের সেই চূড়ান্ত মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই সামিনা দুহাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। চল্লিশ ছুঁইছুঁই একজন পরিণত নারী হয়েও সে কিশোরীর মতো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠছে। তার মনে হলো, গত কয়েক বছরে সে নিজেকে এতটা নগ্নভাবে অনুভব করেনি। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোটা সামিনার স্বভাববিরুদ্ধ, কিন্তু কালকের সেই ‘হরমোনাল রাশ’ যেন তাকে কোনো এক আদিম বনলতার মতো জড়িয়ে ধরেছে। আর এই সবকিছুর মূলে একজনই মানুষ—মোর্শেদ। মোর্শেদের সেই গভীর দৃষ্টি, তার মেটিওর ৩৫০-এর সেই ধকধকানি আর তার শক্ত পিঠের ওপর সামিনার নিজের অবাধ্য হাতের স্পর্শ—সব যেন এক হয়ে কাল রাতে সামিনাকে এক নিষিদ্ধ আগ্নেয়গিরির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। “ছিঃ সামিনা! কী হচ্ছে এসব তোমার?”—সে বিড়বিড় করে নিজেকেই ধমক দিল। তার ফরসা, ভরাট গাল দুটো তখন ভোরের রক্তিম সূর্যের চেয়েও বেশি লাল হয়ে উঠেছে। অলসভাবে বিছানায় আরও কিছুক্ষণ পড়ে থাকলে এই কামনার জাল তাকে আরও বেশি করে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াবে, সেটা সে ভালো করেই জানে। তাই সে একরকম জোর করেই বিছানা ছেড়ে উঠল। শরীরটা ভারি হলেও মনের ভেতর এক ধরণের অস্থিরতা তাকে তাড়া করে নিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের আয়নায় দাঁড়াতেই সামিনা থমকে গেল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে চোখের নিচে সামান্য কালি, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে আর চোখের মণিতে একটা অজানা তৃপ্তির দ্যুতি। সে দ্রুত মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। আজ মঙ্গলবার, স্কুলে আর্টের ক্লাস আছে। সকালে রান্না, নাস্তা আর টুকটাক ঘরের কাজ সেরে তবেই তাকে বেরোতে হবে। তার মা এখনো ঘুমোচ্ছেন, ডায়াবেটিক রোগীর জন্য এই সকালের ঘুমটুকু খুব জরুরি। সামিনা আর দেরি করল না। শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজ সে কালকের মতো গভীরে ডুব দিতে চায় না। কালকের সেই পুলক, সেই শরীরের খিঁচুনি আর তৃপ্তির পর আজ এক ধরণের শূন্যতাও আছে। সে বারবার নিজেকে বোঝাল, মোর্শেদ কেবলই একজন পুরুষ যে তাকে একটু সাহায্য করেছে। কিন্তু তার অবাধ্য মন বলছে অন্য কথা। মোর্শেদের সেই ‘সামিনা’ ডাকটা যেন এখনো তার কানের কাছে গুঞ্জন করছে। দ্রুত গোসল সেরে বের হয়ে সে রান্নাঘরে ঢুকল। চুলায় ডাল বসিয়ে দিয়ে সে রুটি বেলতে শুরু করল। তার ফরসা হাত দুটোর প্রতিটি নড়াচড়ায় একটা ছন্দ আছে। বেলন আর পিরিচের সেই শব্দে সামিনা চেষ্টা করছে বাইরের পৃথিবীর বাস্তবতায় ফিরে আসতে। কিন্তু রান্নাঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে যখন সকালের প্রথম সোনালি রোদটা তার ভরাট শরীরের ওপর এসে পড়ল, তখন তার আবার মনে পড়ে গেল মোর্শেদের কথা। মোর্শেদ কি এখন ঘুমোচ্ছে? রুটি সেঁকতে সেঁকতে সামিনা নিজের অজান্তেই মুচকি হাসল। মগজের কোণে একবার মোর্শেদকে স্থান দিতেই সেখানে হাজারো ডালপালা মেলতে শুরু করল কামনার লতা। সে ভাবল, মোর্শেদকে কি আজ একটা মেসেজ দেওয়া উচিত? না, থাক। আগে সে-ই দিক। সামিনা তো আর এতো সস্তা নয়। সে একজন শিক্ষিকা, তার একটা মর্যাদা আছে। কিন্তু এই যুক্তিগুলো খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে মোর্শেদের সেই পুরুষালি ঘ্রাণের টানে। দ্রুত সব কাজ গুছিয়ে ফেলল সামিনা। মায়ের নাস্তা আর ওষুধ টেবিল গুছিয়ে রাখা শেষ। এবার তার নিজের বেরোনোর পালা। নীল রঙের সালওয়ার কামিজ বেছে নিল সে আজ। আর্ট টিচার হিসেবে তার রুচিটা একটু অন্যরকম। হালকা সাজলেও তার ভরাট শরীরের গঠন এমনিতেই মানুষের নজর কাড়ে। চুলে কেবল হাতখোঁপা করে একটা ক্লিপ এঁটে দিল। বের হওয়ার আগে একবার ফোনটা হাতে নিল সে। না, মোর্শেদের কোনো মেসেজ নেই। সামিনা একটু দমে গেল। গত দুইতিন দিন এ তো দেখেছে এর মধ্যে একটা মেসেজ মোর্শেদ তাকে পাঠিয়ে দেয়। তার মানে কি মোর্শেদ কালকের ছবিটা দেখার পর সব মিটিয়ে ফেলেছে? নাকি সে-ও কোনো খেলায় মেতেছে? এমনও হতে পারে মোর্শেদ এখনও ঘুমিয়ে আছে। সামিনা ফোনের লক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার আঙুলগুলো কাঁপছে একটা মেসেজ টাইপ করার জন্য। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। ফোনটা ব্যাগে পুরে সে দরজায় তালা লাগাল। স্কুলের স্টাফরুম তখন প্রায় ফাঁকা। অধিকাংশ শিক্ষিকাই ক্লাসে অথবা টিফিন খেতে ব্যস্ত। সামিনা জানালার ধারের নিজের চেয়ারটায় বসে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। সারাদিন আজ মনটা কু গাইছে, একটা অস্থিরতা তাকে তাড়া করে ফিরছে। সে জানত, মোর্শেদে একবার মেসেজ না করলে এই অস্থিরতা কাটবে না। কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে টাইপ করল— “শুভ সকাল। শরীর ঠিক আছে তো আপনার? কাল অতটা পথ বাইক চালালেন, ধকল তো কম যায়নি।” মেসেজটা সেন্ড করে সামিনা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবেনি মোর্শেদ এত দ্রুত উত্তর দেবে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টুং করে শব্দ হলো। মোর্শেদ: “আরে! আপনি আগে মেসেজ করেছেন? আজ মনে হয় সূর্য উল্টো দিকে উঠেছে! আমি তো ভাবলাম সামিনা আপা বুঝি আমাকে ভুলেই গিয়েছেন।” সামিনার ঠোঁটে একটা পাতলা হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল— সামিনা: “ভুলে যাওয়ার মতো কী হলো? আপনি কাল অনেক কষ্ট করেছেন, তাই ভদ্রতার খাতিরে খোঁজ নিলাম। আপনি তো দেখি সব সময় ঠাট্টা করেন।” মোর্শেদ: “ঠাট্টা করছি না সামিনা। আসলে আপনার মেসেজ পেয়ে সত্যি খুব ভালো লাগছে। আমার শরীর একদম ঠিক আছে। আসলে কালকের রাইডটা আমি খুব এনজয় করেছি। তবে শরীরের চেয়েও বেশি জরুরি আপনার খবর। স্কুলে কি খুব ব্যস্ত আপনি? আপনার গলার স্বরটা কিন্তু কাল একটু ক্লান্ত শোনাচ্ছিল।” সামিনা: “স্কুলে তো ব্যস্ত থাকতেই হয়। আজ ক্লাসে বাচ্চাদের নিয়ে অনেক কাজ। তবে আমি ক্লান্ত নই, মেজাজটা একটু ফুরফুরে আছে আজ। আর আপনি? আপনি এখন কোথায়?” মোর্শেদ: “আমি একটা কাজে বাইরে বেরিয়েছিলাম। আপনার কথা মনে পড়ছিল, ভাবলাম মেসেজ করি, কিন্তু ভাবলাম আপনার ক্লাসের ডিস্টার্ব হবে। আপনি যে শরীরের খোঁজ নিতে চাইলেন, তার মানে কি আমার জন্য একটু মায়াও কাজ করছে মনে?” সামিনা: “আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন মোর্শেদ সাহেব। শরীরের খোঁজ নেওয়ার অধিকার তো যে কেউ নিতে পারে। মানুষ হিসেবে কি আপনার সুস্থতা আমার কাম্য নয়?” মোর্শেদ: “অবশ্যই। তবে আপনার মতো মানুষের কাছ থেকে এইটুকু যত্ন পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। কিছু মানুষের কথা এমনিই মনে গেঁথে যায়। আচ্ছা, আপনি কি দুপুরে ঠিকমতো খেয়েছেন? বাচ্চাদের বকাঝকা করতে গিয়ে নিজের খাওয়ার কথা ভুলে যাবেন না কিন্তু।” সামিনা জানালার বাইরে তাকাল। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসছে। মোর্শেদের এই সহজ-সরল যত্নটুকু তাকে ভেতরে ভেতরে বিগলিত করছে। কোনো বড় পরিকল্পনা নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই—কেবল এই বর্তমানের ভালো লাগাটুকু সে উপভোগ করছে। সামিনা: “হ্যাঁ, খেয়েছি। আমার টিফিন টাইম প্রায় শেষ। ক্লাসে যেতে হবে। আপনি এখন বাইক নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?” মোর্শেদ: “আমি এখন বাসায় ফিরব। কাজ শেষ। আপনি সাবধানে থাকবেন। স্কুল শেষ করে সাবধানে বাসায় ফিরবেন।” সামিনা: “আপনিও বাইক নিয়ে বের হলে সাবধানে থাকবেন। কাল দেখেছি আপনি অনেক ‘রাফ’ বাইক চালান। আমার কিন্তু পেছনে বসে খুব ভয় লাগছিল। বেশি গতি তুলবেন না প্লিজ।” মোর্শেদ: “বা রে! কাল তো আপনি কিছু বলেননি। আচ্ছা ঠিক আছে, আপনার কথা মাথায় থাকবে। আজ থেকে স্পিড লিমিট আপনার হাতে। ভালো থাকবেন সামিনা।” সামিনা: “বিকেলে বাড়ি ফিরে মেসেজ করব। এখন রাখি। আল্লাহ হাফেজ।” সামিনা ফোনটা ব্যাগে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মোর্শেদ মানুষটা যেমন রহস্যময়, তেমনি সহজ। তার কথা বলার ভঙ্গিতে একটা সম্মানবোধ আছে, যা সামিনাকে আরও বেশি তার প্রতি আকৃষ্ট করছে। ক্লাসে যাওয়ার আগে সে আয়নায় নিজের ওড়নাটা একবার ঠিক করে নিল। তার মনে হলো, আজকের নীল রঙটা যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। স্কুলের শেষ ঘণ্টা বাজার পর সামিনা যখন বাসায় ফিরল, তখন তার মনের কোণে এক চিলতে রোদ ঝিলিক দিচ্ছিল। সারাটা দিন বাচ্চাদের ড্রয়িং খাতা দেখতে দেখতেও তার চোখ বারবার ফোনের স্ক্রিনে চলে গেছে। বাসায় ফিরে দ্রুত হাতে কাপড় বদলে, ফ্রেশ হয়ে সে যখন নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিল, তখন বিকেল। ম্লান আলোয় ঘরটা মায়াবী হয়ে আছে। সামিনা ফোনটা হাতে নিল। একরাশ দ্বিধা নিয়ে সে টাইপ করল— “বাড়ি ফিরলাম। আপনি কি বাসায়?” মিনিট পাঁচেক পর মোর্শেদের ছোট একটা রিপ্লাই এল। মোর্শেদ: “আমি একটু ব্যস্ত আছি সামিনা। পরে আপনার সাথে কথা বলছি। ভালো থাকবেন।” সামিনা একটু দমে গেল। মোর্শেদ মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই কত সহজভাবে কথা বলল, আর এখন কেমন যেন কেজো গাম্ভীর্য। সে ভাবল, হয়তো জরুরি কোনো কাজ। সে আর ফিরতি মেসেজ করল না। সন্ধ্যা নেমে রাত বাড়ল। মা নামাজ পড়ে তসবি জপছেন। টিভির মৃদু শব্দ ভেসে আসছে পাশের ঘর থেকে। সামিনা ড্রয়িং রুমে বসে একটা গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মন বসল না। ঘড়িতে তখন রাত আটটা। সে একবার মেসেঞ্জার চেক করল। মোর্শেদ ‘একটিভ’ নেই। একটা চাপা অস্থিরতা তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে কি আরেকবার মেসেজ করবে? নাকি তাকে খুব ‘ডেস্পারেট’ মনে হবে? তবুও আঙুলগুলো মানল না। সে লিখল— “কাজ কি শেষ হলো? চা খেয়েছেন?” মেসেজটা ‘সেন্ট’ হয়ে পড়ে রইল। ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। সামিনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল চ্যাটবক্সের দিকে। সিন হলো না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা টেবিলে রেখে মায়ের কাছে গেল। রাত দশটা। রাতের খাবার টেবিলে বসে সামিনা আনমনে ডাল নাড়ছে। তার মা জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে সামু, শরীর খারাপ নাকি? খাচ্ছিস না যে?” সামিনা হাসার চেষ্টা করে বলল, “না মা, এমনিই। আজ স্কুলে একটু খাটুনি গেছে।” টেবিলের নিচে তার হাতে ধরা ফোনটা সে বারবার অন করছে। না, কোনো নোটিফিকেশন নেই। মোর্শেদ কি কোনো বিপদে পড়ল? নাকি তার বাইকটা নিয়ে আবার কোনো ঝামেলা হলো? ‘রাফ’ বাইক চালানোর কথা মনে পড়তেই সামিনার বুকটা একটু কেঁপে উঠল। মানুষটা যেমনই হোক, তার সুস্থতা এখন সামিনার কাছে খুব প্রার্থিত। খাবার শেষ করে সে নিজের ঘরে এল। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। আজ কেন জানি তার ঘুম আসছে না। সে ফোনের ডাটা অন রেখেই শুয়ে পড়ল। বারবার মনে হচ্ছিল, মোর্শেদ হয়তো ভুলেই গেছে তাকে। কালকের সেই রাইড, আজকের সেই মিষ্টি আলাপ—সবই কি তবে সাময়িক কোনো ভালো লাগা ছিল? এক ধরণের বিষণ্ণতা তাকে জাপটে ধরল। সে নিজেকেই নিজে ধমক দিল— “কেন এত ভাবছ ওকে নিয়ে? ও তো কেবল কয়েকদিনের পরিচিত!” চোখের পাতা যখন ভারি হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ফোনের সেই পরিচিত ভাইব্রেশন। সামিনা এক ঝটকায় উঠে বসল। স্ক্রিনে মোর্শেদের নামটা ভেসে উঠছে। মোর্শেদ: “খুব সরি সামিনা। আপনার মেসেজগুলো দেখেছি কিন্তু রিপ্লাই দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেল আজ। রাস্তায় একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম।” সামিনা মেসেজটা পড়ল। তার মনের সব মেঘ যেন মুহূর্তেই কেটে গেল। কিন্তু সে চাইল একটু অভিমান দেখাতে। সে ভাবল, মোর্শেদকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে সে সারা রাত তার জন্যই জেগে ছিল। সে টাইপ করল— “ওহ। আমি ভাবলাম আপনি বোধহয় হারিয়েই গেলেন। এত রাত পর্যন্ত কিসের কাজ আপনার?” মোর্শেদ: “হারিয়ে যাওয়ার মতো মানুষ আমি নই সামিনা। বিশেষ করে আপনার মতো কারো খোঁজ পাওয়ার পর। সত্যি বলতে, আজ সারাটা দিন আপনার ওই ভোরের মেসেজটার কথা মনে পড়ছিল। যাই হোক, আপনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? আমি কি আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম?” সামিনা বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। এই একটা মেসেজেই তার সারাদিনের অপেক্ষা যেন সার্থক হলো। সামিনা মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনের কোণে জমে থাকা মেঘগুলো পুরোপুরি সরেনি। সে টাইপ করল— “এত রাতে ফেরার সময় পেলেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন যে কাউকে একটা মেসেজ করার কথা ছিল। আমার খোঁজ না নিলেও চলত, আমি তো আর আপনার কেউ নই।” মোর্শেদের রিপ্লাই এল দ্রুত। মোর্শেদ: “অভিমানটা কি একটু বেশি হয়ে গেল না? আমি কিন্তু ইচ্ছে করে দেরি করিনি। আর আপনি ‘কেউ নন’—এ কথাটা কি মন থেকে বললেন? যাই হোক, আজ শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে সামিনা। এই ছোট স্ক্রিনে টাইপ করতে আর ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আপনার সাথে একটু কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। একটা ফোন দেব কি?” সামিনা একটু থমকাল। এত রাতে ফোন! মা পাশের ঘরেই ঘুমোচ্ছেন। যদিও দেয়াল বেশ পুরু, তবুও একটা সংকোচ কাজ করছে। সে একটু কঠোর হওয়ার ভান করে লিখল— সামিনা: “ক্লান্ত লাগলে শুয়ে পড়ুন, কাল কথা হবে। অযথা জেগে থাকার দরকার নেই।” মোর্শেদ: “শুয়ে তো আছিই, কিন্তু ঘুমানোর জন্য তো চোখে ঘুম আসতে হবে। কালকের সেই রাইডের পর আজ সারাদিন আপনার কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অবশ্য আপনার যদি খুব সমস্যা থাকে বা কথা বলতে ইচ্ছে না করে, তবে থাক। আমি জোরাজুরি করব না। ভালো থাকবেন।” মোর্শেদের এই ‘ভালো থাকবেন’ বলাটা সামিনার বুকে গিয়ে বিঁধল। সে বুঝল লোকটা হয়তো সত্যিই ক্লান্ত এবং কিছুটা হতাশ। সামিনা এক মিনিট কোনো রিপ্লাই দিল না। সে বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রয়ার থেকে তার নীল রঙের হেডফোনটা বের করল। ফোনের ভলিউম কমিয়ে সে আবার কম্বলের নিচে ঢুকে পড়ল। তারপর টাইপ করল— “হেডফোনটা আনতে গিয়েছিলাম। এবার ফোন করুন।” মেসেজটা ‘সিন’ হওয়ার পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। ‘মোর্শেদ’ নামটা কাঁপছে। সামিনা বুকটা একবার দুরুদুরু করে উঠল। সে রিসিভ করে হেডফোনটা কানে গুজে দিল। ওপাশ থেকে কেবল একটা গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। সামিনা একটু অধিকারের সুরে, গলা নামিয়ে বলল— “হ্যালো? কই, চুপ করে আছেন কেন? এবার বলুন, সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরলেন যে মেসেজ করার সময়টুকুও পেলেন না?” সামিনা বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে হেডফোনটা কানের সাথে আরও চেপে ধরল। মোর্শেদের গলার স্বরটা শোনার জন্য সে যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল। ওপাশ থেকে মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর খুব ধীরলয়ে, একদম খাদের দিকের গলায় বলল— “সামিনা, আজকে একটু টঙ্গি গিয়েছিলাম। মোর্শেদের মুখ থেকে নিজের নামটা এভাবে শোনা মাত্রই সামিনার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ধক করে উঠল। হেডফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই গভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বরটা যেন বিদ্যুতের মতো সামিনার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মোর্শেদের গলার স্বরের সেই সূক্ষ্ম কম্পন হেডফোনের তার বেয়ে সরাসরি সামিনার মগজে আঘাত করতে লাগল। সামিনা অনুভব করল, মোর্শেদের কণ্ঠটা ঠিক তার মেটিওর ৩৫০ বাইকটার ইঞ্জিনের মতোই গম্ভীর আর ছন্দময়। সেই স্বরে এক ধরণের আদিম মাদকতা আছে, যা শুনলে মনে হয় কোনো শক্তিশালী পুরুষ খুব কাছ থেকে তার কানের কাছে ফিসফিস করছে। সামিনার মনে হলো, এই স্বরটা যেন তাকে সম্মোহিত করে ফেলছে। সে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তার নিজের নিশ্বাসের শব্দও যেন তার কাছে ভারী মনে হচ্ছে। সে মোর্শেদের সেই কণ্ঠের রেশটুকু নিজের ভেতরে অনুভব করার চেষ্টা করল। সামিনা: (একটু থতমত খেয়ে, গলাটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে) “টঙ্গি? আজকে আবার টঙ্গি গেলেন কেন? বাইকে করেই গেছিলেন নিশ্চয়ই? মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) “হ্যাঁ, বাইক ছাড়া তো আমার গতি নেই। তবে টঙ্গির সেই ঘিঞ্জি রাস্তায় বাইক চালাতে চালাতে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছিল—কাল যে মানুষটা আমার পেছনে বসে আমার কাঁধ খামচে ধরেছিল, সে পাশে থাকলে এই ধুলোবালিগুলোও বোধহয় আমার কাছে সুগন্ধি মনে হতো। আপনি কি খুব রাগ করেছেন সামিনা? আমি সত্যিই আজ সময় পাইনি।” মোর্শেদের এই সরাসরি ‘আপনি পাশে থাকলে’ বলার ভঙ্গিটা সামিনাকে আবার সেই কালকের রাইডের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সে অনুভব করতে পারল, কালকের সেই বাইকের কম্পন আর আজকের মোর্শেদের গলার স্বরের কম্পন যেন একই সূত্রে গাঁথা। সামিনা: (মৃদু স্বরে) “রাগ করার অধিকার কি আমাকে দিয়েছেন আপনি? আমি তো ভাবলাম, আপনার সেই মেটিওর আর আপনি—আপনারা দুজনেই বুঝি আমাকে ভুলে গিয়ে অন্য কোথাও হারিয়ে গেছেন। অত রাতে ফিরলেন, পথে কি খুব কষ্ট হয়েছে আপনার?” মোর্শেদ: “কষ্ট হয়নি সামিনা। তবে ফিরতি পথে যখন হাইওয়েতে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো পেছন দিকে সরে যাচ্ছিল, তখন খুব একা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, পেছনের সিটটা বড্ড বেশি খালি। আপনি কি জানেন সামিনা, আপনার ওই হালকা নিশ্বাসের শব্দটা যেটা কাল আমার পিঠে লাগছিল, সেটা আমি আজও মিস করছি।” সামিনা একদম চুপ হয়ে গেল। তার ফর্সা গাল দুটো অন্ধকারের মধ্যেও লাল হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ যে এতটা অকপটে তার অনুভূতির কথা বলবে, সেটা সে ভাবেনি। এই পুরুষালী কণ্ঠের অতল গহ্বরে সে যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবার আরও খানিকটা নিচু হয়ে এল। হেডফোনের ওপার থেকে তার প্রতিটি শব্দ যেন সামিনার কানের লতিতে উষ্ণ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। মোর্শেদ: “সামিনা, একটা কথা ভাবছিলাম। এই যে আমরা এত কথা বলছি, এত কাছে আসছি... এখনো কি ওই ‘আপনি-আজ্ঞে’র দেয়ালটা রাখা খুব জরুরি? আমি কি তোমাকে ‘তুমি’ করে ডাকতে পারি?” সামিনা একটু চমকাল, যদিও মনে মনে সে এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে চট করে ধরা দিল না, একটু ছলনা মিশিয়ে উত্তর দিল। সামিনা: “আরে! আপনি তো দেখি খুব সুযোগ সন্ধানী। এক দিনের আলাপেই ‘তুমি’তে নেমে আসতে চাইছেন? আমি তো আর্ট টিচার, আমার ছাত্রছাত্রীরাও আমাকে আপনি বলে। আপনাকে এত সহজ অনুমতি কেন দেব?” মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) “অনুমতি তো মনের ভেতর থেকে অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছেন, শুধু মুখে বলতে বাধা দিচ্ছে ওই আভিজাত্য। শোনো সামিনা, এই ‘তুমি’ শব্দটার মধ্যে যে অদ্ভুত একটা টান আছে, সেটা ‘আপনি’তে নেই। আমি চাই আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব না থাকুক।” সামিনা: “আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। আজ থেকে না হয় ‘তুমি’ই হলো। কিন্তু শর্ত একটাই—বেশি প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না।” মোর্শেদ: “ধন্যবাদ। তাহলে তুমিও আমাকে ‘তুমি’ করেই বলবে এখন থেকে। কেমন?” সামিনা: (একটু অপ্রস্তুত হয়ে) “উমম... ওটা এখনই পারব না। আমি অত সহজে কাউকে তুমি বলতে অভ্যস্ত নই। আমার একটু সময় লাগবে, মোর্শেদ সাহেব।” মোর্শেদ: “ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব। আচ্ছা, তোমার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তো কিছুই জানা হলো না। যেমন ধরো—তোমার কী বেশি পছন্দ? পড়ন্ত বিকেল নাকি মায়াবী সন্ধ্যা?” সামিনা একটু ভাবল। সে সোজাসুজি উত্তর দিতে পছন্দ করে না, তার শিল্পমনা মন সবকিছুর মধ্যেই সৌন্দর্য খোঁজে। সামিনা: “আসলে সরাসরি কোনো একটা বলা কঠিন। আমার বিকেল পছন্দ কারণ তখন সূর্যটা বিদায়ের আগে আকাশটাকে আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেয়। আবার সন্ধ্যাও প্রিয় কারণ তখন এক অদ্ভুত নির্জনতা নামে। আর রাত? রাত তো আমার সবচেয়ে প্রিয়, কারণ তখন ডায়েরির পাতায় বা ক্যানভাসে নিজের সাথে নিজে কথা বলা যায়। তাই আমার কাছে সময়টা বড় নয়, ওই সময়ের অনুভূতিটাই আসল।” মোর্শেদ: “দারুণ বলেছ! তোমার উত্তরটা ঠিক তোমার আঁকা ছবির মতোই গভীর। এবার তোমার পালা, কিছু জিজ্ঞেস করবে?” সামিনা: “আচ্ছা, আপনার তো সারাক্ষণ ওই সিগারেট আর বাইক নিয়ে কারবার। এই সিগারেট ছাড়া আপনার আর কী খেতে সবচেয়ে পছন্দ?” মোর্শেদ: “তোমাকে।” সামিনা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। এই একটা শব্দে যেন পৃথিবীর সব স্পন্দন থেমে গেছে। সে থতমত খেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল— সামিনা: “মানে? আপনি... আপনি এসব কী বলছেন মোর্শেদ?” কৌতুকের সুরে মোর্শেদ বলল— মোর্শেদ: তুমি তো আমাকে কথাটাই শেষ করতে দিলে না সামিনা। আমি বলতে যাচ্ছিলাম— ‘তোমাকেও এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম’, মানে তোমার কী খেতে পছন্দ সেটা। কিন্তু আমি ‘তোমাকে’ বলার পরেই তুমি একদম চমকে গিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিলে! তাই বাক্যটা আধো রয়ে গিয়ে ওরকম শুনিয়েছে।” সামিনা এবার বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে হাসতে লাগল। তারা দুজনেই ঠাট্টাটা বুঝেছিল একদম প্রথমেই। সামিনা: (হাসতে হাসতে) “আপনি একটা আস্ত শয়তান! মোর্শেদ: (হেসে কুটিপাটি হয়ে) “হা হা হা! তোমার ওই ‘মানে?’ বলাটা শুনলে তুমি নিজেই হাসতে। বিশ্বাস করো সামিনা, তোমাকে ওভাবে ঘাবড়ে দেওয়ার মজাই আলাদা।” দুজনই কিছুক্ষণ একসাথে ফোনে হাহাহা করে হাসতে লাগল। রাতের সেই স্তব্ধতা তাদের হাসির শব্দে যেন এক অন্যরকম উৎসবে রূপ নিল। হাসির রেশ কাটলে সামিনা একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামিনা: “অনেক রাত হলো মোর্শেদ। কাল আবার স্কুলে যেতে হবে। আজকে আর না, কাল আবার কথা হবে আমাদের। এবার কিন্তু সত্যি ঘুমোতে যান।” মোর্শেদ: “ঠিক আছে। তুমিও ঘুমাও। কালকের ভোরের মেসেজটার অপেক্ষায় থাকব কিন্তু। শুভ রাত্রি, সামিনা।” সামিনা: “শুভ রাত্রি।” সামিনা ফোনটা রেখে হেডফোনটা খুলল। তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা তখনো লেপ্টে আছে। মোর্শেদ মানুষটা তাকে মুহূর্তের মধ্যে হাসাতেও পারে, আবার ভাবাতেও পারে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবল— ‘তুমি’ বলাটা হয়তো খুব একটা কঠিন হবে না।