প্রেমের কাহিনী, সিজন ২ — এপিসোড ৫

Premer Kahini, Season 2 — Episode 5

সৃজন সৃষ্টির অন্ধকার জীবনে কোল আলো করে এলো ওদের‌ সন্তান সূর্য। বস্তির অন্ধকার কানাগলি পেরিয়ে সূর্য কি পারবে অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে?

লেখক: Chodon Kumar

ক্যাটাগরি: ভাই বোনের প্রেম

সিরিজ: প্রেমের কাহিনী, সিজন ২

প্রকাশের সময়:29 Jul 2025

আগের পর্ব: প্রেমের কাহিনী, সিজন ২ — এপিসোড ৪

আগের পর্বের পর…

রোজকার নিয়ম মেনে ভোর হয়েছে বস্তিতে। সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে কলরবে মুখর হয়ে উঠেছে নিস্তব্ধ বস্তি। সৃষ্টি সেই সকালে উঠে রান্নার কাজ সেরে সৃজনে খাইয়ে বেরিয়ে গেছে স্কুলে। সূর্য তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন। ছেলের দিকে তাকিয়ে সৃজন ভাবে ছেলেটা বড্ড ঘুম কাতুরে হয়েছে। হাজার ডাকলেও সকালে উঠতে চায় না কিছুতেই। এদিকে স্কুলের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ছেলেকে তাড়াতাড়ি ডেকে তুলে স্কুলের জন্য তৈরি হতে বলে সৃজন। সূর্য‌ও রোজকার মতো উঠে তৈরি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে।

কলতলা পার হওয়ার সময়ে দেখে, বসে বসে বাসন মাজছে রিতা। রিতার দিকে তাকিয়ে হাসে সূর্য। চোখ নামিয়ে এক মনে বাসন মাজতে থাকে রিতা। একবারের জন্যেও তাকাচ্ছে না দেখে রাগ চড়ে যায় সূর্যের মাথায়। মনে মনে বলে, ‘ভাব দেখনা মাগীর, মনে হয় আমাকে দেখেই নি!’ এদিকে বাসন মাজতে মাজতে রিতা মনে মনে বলতে থাকে, ‘ইসস ভাব দেখাচ্ছে, যেন বড় ইস্কুলে যাচ্ছে! যাচ্ছে তো ওই বালগুলোর সঙ্গে সিগারেট টানতে।’

কলতলা পেরিয়ে আস্তে আস্তে সূর্য এগিয়ে যায় ওদের আড্ডার জায়গাটার দিকে। কেমন যেন ফিসফিস করে কথা বলছে আজ ন্যাড়া আর ঘোঁতন। সূর্যকে দেখে প্রতিদিনের মতো হেসে “কি বে সূর্য” বলে সম্বোধন করল না দেখে যেন একটু অবাকই হল সূর্য। বরং কেমন যেন একটু চমকে উঠল ওরা সূর্যকে দেখে!

সূর্য – কিবে ভুত দেখছিস নাকি? অমন করে চেয়ে আছিস কেন?

ঘোঁতন – এমনি। আয় বস।

সূর্য দেখে ন্যাড়া, ঘোঁতন দুজনেই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে ওর দিকে! কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা সূর্য। হঠাৎ ওর নজর যায় একটা জারের দিকে। ভেতরে তেলের মতো একটা তরল পদার্থ রয়েছে।

সূর্য – কিবে তোরা তেলের ব্যাবসা শুরু করলি নাকি?

ন্যাড়া – (থতমত খেয়ে) না না, ওই পাশের দোকানের পেট্রোল শেষ হয়ে গেছে, তাই আমাদের আনতে দিয়েছিল। চল ঘোঁতন পেট্রোলটা দিয়ে আসি।

ঘোঁতন উঠে দাড়াতেই ওর কোল থেকে একটা ব্যাগ পড়ে যায়। সূর্য তাকিয়ে দেখে ব্যাগটা টাকায় ভর্তি। দেখেই আঁৎকে ওঠে সূর্য।

সূর্য – কিবে চুরি করেছিস তোরা!

ঘোঁতন – নাবে! বললাম না দোকানের টাকা এগুলো। আমাদের কাজ আছে, তুই ইশকুলে যা এখন।

সূর্যকে রেখেই চলে গেল ন্যাড়া আর ঘোঁতন। অগত্যা কি আর করা! মন না চাইলেও স্কুলের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় সূর্য। আজ অনেকদিন পরে স্কুলে এসেছে ও, কিন্তু মনটা পড়ে আছে ন্যাড়াদের ওখানে। নিশ্চয়ই ওর কাছে কিছু একটা লুকোচ্ছে ওরা। কিন্তু কী লুকোচ্ছে? ভেবে পায়না সূর্য। অতগুলো টাকাই বা ওরা পেলো কোথায়?? এসব ভাবতে ভাবতেই ক্লাস শেষ হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে আসে সূর্য।

মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারছে না ব্যাপারটা! কেমন যেন খচখচ করছে মনের ভেতরে। সন্ধ্যার পরে রিতার কাছে যাওয়ার কথা ভাবলেও কেন যেন মন টানলো না! মনের ভেতর খচখচানিটা যাচ্ছে না। কী লুকোচ্ছে ন্যাড়া আর ঘোঁতন সূর্যর কাছ থেকে! রাতে অনেকক্ষণ ভেবেও কোনো কুল কিনারা না পেয়ে ঘুমাতে যায় সূর্য।

রাত প্রায় তিনটে। একটা পেট্রোলের জার হাতে নিয়ে সমিতির সেই পরিত্যক্ত ঘরটার কাছে এসে দাঁড়ায় ন্যাড়া আর ঘোঁতন। চারপাশ নিরব, নিস্তব্ধ। দক্ষিন দিক থেকে বাতাস বইছে। অনভ্যস্ত হাতে পেট্রোল জারটা খুলে পেট্রোল ছেটাতে থাকে ঘরটার গায়ে। ওরা ভেবেছে কেবল এই বাড়িটাই পুড়বে, কিন্তু রাতের বাতাসে পেট্রোল ছড়িয়ে পরার ভয়াবহতা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই ওদের। পেট্রোল ছেটানো শেষ হতেই দেশলাই বের করে আগুন জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারে দেওয়ালের গায়ে। মূহুর্তের মধ্যে জ্বলে ওঠে পরিত্যক্ত বাড়িটা এবং সেইসঙ্গে বাতাসে পেট্রোল মিশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে আগুন। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলনা! দূরে কে যেন চেঁচিয়ে ওঠে আগুন আগুন বলে। লোকজন জেগে গেছে টের পেয়ে যেন সম্বিত ফিরে পায় দুজনে। ন্যাড়া চেঁচিয়ে বলে ওঠে, “তাড়াতাড়ি পালা ঘোঁতন!” দৌড়ে মিশে যায় ওরা রাতের অন্ধকারে। বাতাস পেয়ে লকলকিয়ে উঠছে আগুনের লেলিহান শিখা। কোনো দানব যেন তার বিশাল জিভটা বের করে ছুটছে সব কিছু গ্রাস করতে।

দ্রুত চারদিকে ছড়াচ্ছে আগুন। আগুনের আঁচ গায়ে লাগতেই ঘুম ভেঙে যায় সৃষ্টির। ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই যেন চোখ ঝলসে ওঠে কমলা রঙের আগুনে। ঘর ভরে উঠেছে ধোঁয়ায়। নিশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। সৃজনও জেগে গেছে, কিন্তু কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সৃষ্টি একবার সূর্যকে ডাকতে যায় কিন্তু নাক মুখে ধোঁয়া ঢুকে কাশিতে দম বন্ধ হয়ে আসে। আগুন আর ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে ঘর। দরজাটা কোথায় ঠিক আঁচ করতে পারছে না। এদিকে সারা বস্তির লোক জেগে গেছে। আগুন আগুন করে চিৎকার করে বালতি হাতে ছুটছে সবাই। এখনই আগুন নেভাতে না পারলে একটা ঘরও বাঁচানো যাবে না আর।

ঘুম ভেঙ্গেছে রিতারও। ওদের ঘরটা বাতাসের উল্টো দিকে থাকায় আগুন এখনো এদিকটায় আসেনি। তারপরেও ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে ওঠে ওর। দৌড়ে বাইরে এসে দেখে সবাই আগুন নেভাতে ছুটছে। আশেপাশে তাকিয়ে সূর্যদের কাউকে দেখতে না পেয়ে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে ওর বুকটা। তাকিয়ে দেখে উত্তপ্ত তন্দুর হয়ে উঠেছে সূর্যদের ঘরটা। সেদিকে দৌড়ে যায় ও।

সামান্য ধাক্কাতেই খুলে যায় পুরতে থাকা দরজাটা। ঘরে ঢুকে ধোঁয়াতে কিছু দেখতে পায়না রিতা। আবছা কানে আসে একটা গোঙানির আওয়াজ। দ্রুত এগিয়ে যায় সেদিকে। তখনো পুরো সংজ্ঞা হারায়নি সৃষ্টি। কাছে গিয়ে রিতা বলে, “দিদিমণি তাড়াতাড়ি ধরুণ আমাকে।”

সৃষ্টিকে দাঁড় করিয়ে দুজন মিলে সৃজনকে দুদিক থেকে ধরে বাইরে বের করে আনে ওরা। বাইরে আসতেই ডুকরে কেঁদে ওঠে সৃষ্টি। “আমার সূর্য! সূর্য এখনো ভিতরে রয়েছে।”

“দিদিমণি আপনি দাড়ান, আমি নিয়ে আসছি ওকে” বলে রিতা আবার দৌড়ে ঢুকে যায় ঘরের মধ্যে। আগুন আরও বেড়ে গেছে ধোঁয়ায় দুচোখ জ্বলে যাচ্ছে রিতার। সূর্যকে দেখতে পেয়ে ওকে দু’হাতে টেনে তোলে রিতা। সূর্য তখন প্রায় অচেতন। সূর্য কে ধরে দরজা পর্যন্ত আনতেই দেখে আগুনে পুড়ে খসে পরছে জ্বলন্ত দরজাটা। রিতা কোনোরকমে ধাক্কা দিয়ে সূর্যকে বাইরে ফেলে দেয় আর জ্বলন্ত দরজার নিচে চাপা পরে ওর শরীরটা। জোরে একটা চিৎকার দিয়ে ওঠে সৃষ্টি। “মেয়েটা চাপা পড়েছে দরজার নীচে।” ততক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে উঠেছে সূর্য। অবিশ্বাস্য চোখে বারবার তাকাতে থাকে আশেপাশে। ঘটনার আকস্মিকতায় কেমন যেন মাথা ঘুরছে ওর। সূর্য যেন এখন একটু একটু বুঝতে পারছে সকালে ন্যাড়া আর ঘোঁতনের অস্বাভাবিক আচরণের কারন। ততক্ষণে লোকজন জ্বলন্ত দরজাটার নীচ থেকে বের করে এনেছে রিতার বেহুঁশ দেহটা। সূর্য ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।

রিতার শরীরের একপাশটা পুরে কেমন দগদগ করছে, ওর লম্বা চুলগুলো পুড়ে কেমন দলা পাকিয়ে আছে মাথার উপরে। কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে রিতার অজ্ঞান দেহটা নিয়ে যায় হাসপাতালের দিকে। আগুন নিভে এসেছে ততক্ষণে। ক্ষয়ক্ষতি বলতে সমিতির ঘরটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, সূর্যদের ঘরটা কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালের মতো। আশপাশের আরো কয়েকটা ঘরের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। লোকজন তাড়াতাড়ি জেগে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো গিয়েছে অনেকটাই।

সমিতির পোড়া ঘরটার একপাশে পড়ে আছে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া একটা লাশ। বিশুর মা বুড়ি বলে চেনাই যাচ্ছেনা লাশটাকে। বস্তির সব লোক জড়ো হয়েছে জায়গাটাতে এসে। ভোরের আলো ফুটে গেছে ততক্ষণে। সৃজনকে রেখে সৃষ্টি আর সূর্য গেল হাসপাতালের দিকে। সৃষ্টি ভাবছে ভয়াল রাতটার কথা! যদি মেয়েটা না থাকতো তাহলে বাঁচতো না ওদের কেউ। ওরা হাসপাতালে গিয়ে শুনলো জ্ঞান ফিরেছে রিতার। তবে ডাক্তাররা এখনো কিছু বলতে পারছে না। নার্স এসে একবার শুধু বলল, “আপনাদের মধ্য সূর্য কে? পেশেন্ট তাকে ডাকছে।”

যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়ায় সূর্য। সবটা এখনো কেমন দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে ওর কাছে। নার্সের পিছন পিছন যায় বার্ন ইউনিটের কাছে। ভেতরে ঢুকে দেখতে পায় রিতার ব্যান্ডেজ মোড়া শরীরটা। আস্তে আস্তে গিয়ে বসে রিতার পাশে। নার্স বেরিয়ে যায় ওকে রেখে। সৃর্যকে দেখে হালকা হাসার চেষ্টা করে রিতা। রিতার একটা হাত নিজের দু হাতের মুঠোয় নেয় সূর্য। অনেক চেষ্টা করেও ভেতর থেকে উঠে আসা কান্নাটাকে আটকাতে পারে না সূর্য।

সূর্য – (কাঁদতে কাঁদতে) বলে তোর কিছু হবে না রিতা, আমি তোর কিছু হতে দেবনা।

রিতা – কেন? আমি তোর কে হ‌ই? কালকেই না বললি যে, আমি কেউ না!

সূর্য – তুই আমার সব। তোকে আমি ভালোবাসি রিতা। অনেক ভালোবাসি।

এই কথাটাই তো রিতা সূর্যের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিল। আর কোনো দুঃখ নেই ওর। ওর জানা হয়ে গেছে সূর্য ওকে ভালোবাসে। হ্যাঁ, সত্যিই ওকে ভালোবাসে সূর্য।

রিতা – কি বললি? আবার বল।

সূর্য – আমি তোকে ভালোবাসি রিতা।

রিতা – ইসস কথা দেখ ছোঁড়ার! আমাকে নাকি উনি ভালোবাসেন। আমি তোকে বলেছি না যে, তোর থেকে আমি বয়সে বড়।

সূর্য – (চোখ মুছতে মুছতে) উঠে দাঁড়ানা আগে, মেপে দেখি কে বড়।

রিতা – (হঠাৎ গম্ভীর হয়ে) সূর্য আমার একটা কথা শুনবি তুই?

সূর্য – তুই ভালো হয়ে যা আগে, একটা কেন, হাজারটা শুনব। তুই যা বলবি, তাই শুনব আমি।

রিতা – আমাকে কথা দে সূর্য, ওই ন্যাড়া আর ঘোঁতনের সঙ্গে আর মিশবি না তুই। প্রতিদিন ইশকুলে যাবি, পড়ালেখা করবি আর বাবা-মায়ের কথা শুনবি, কথা দে আমাকে।

সূর্য – কথা দিলাম। তুই যা যা বললি, সব শুনব আমি।

রিতা – দেখব কেমন রাখিস আমাকে দেওয়া কথা! আমি যদি মরেও যাই ভুত হয়ে নজর রাখব তোর উপরে বলে দিলাম।

সূর্য – তোর কিছু হবে না বললাম তো। আমি কিচ্ছু হতে দেব না তর।

রিতা – তুই আসলেই অনেক ভালা রে সূর্য। এই সূর্য একটাবার চুমু খাবি একটু আমাকে?

সূর্য ওর ঠোঁট দুটো নামিয়ে আনে রিতার কপালের উপরে। হঠাৎ একটা হেঁচকি তোলে রিতা। তারপরেই ওর মাথাটা কাৎ হয়ে যায় বালিশের এক পাশে। সূর্যর ধরে থাকা হাতটাও কেন যেন শিথিল হয়ে আসে। প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেনা সূর্য। রিতাকে ডাকতে থাকে সমানে…

সূর্য – রিতা, এই রিতা কী হল তোর? কথা বলছিস না কেন? চোখ খোল দেখ রিতা, এই রিতা।

হঠাৎ রিতাআআআ বলে জোরে একটা চিৎকার করে সূর্য। ওর চিৎকার শুনে ডাক্তার, নার্স, সৃষ্টি সবাই দৌড়ে আসে। ডাক্তার তাড়াতাড়ি করে গিয়ে রিতার হাতটা তুলে নেয় হাতে। নাড়ী পরীক্ষা করে বলে, “সরি আমাদের আর কিছুই করার নেই।”

হাসপাতালের জানালা গলে সকালের সোনালি রোদ এসে পড়েছে রিতার মুখের উপর। সূর্যের সোনালী আলোতে অদ্ভুত মায়াবী লাগছে মুখটা। দেখে মনে হয় যেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে রিতা, ঘুমের ঘোরেই যেন এক চিলতে হাসি লেগে আছে ওর দু ঠোঁটে। বোবা দৃষ্টিতে সূর্য চেয়ে আছে মুখটার দিকে।

স্থানীয় কাউন্সিলর পুলিশ নিয়ে এসে দেখে গিয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য ঘর বানানোর দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। সমিতির ঘরটা আবার নতুন করে বানিয়ে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন। আপাতত সূর্যরা বাড়ির উঠোনেই তিরপলের তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছে।

দুপুর হয়ে গেছে। বস্তির পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। সমিতির পোড়া ঘরটা আর সূর্যদের আধাপোড়া ঘর সাক্ষ্য দিচ্ছে গত রাত্রির ঘটনার। সমিতির ঘরটার সামনের বিশাল আম গাছটার ছায়াতে পাশাপাশি দুটি খাটিয়ার উপরে শুয়িয়ে রাখা হয়েছে বু বিশুর মা বুড়ি আর রিতাকে। খবর পেয়ে বাপের বাড়ি থেকে এসেছে লাবণী বৌদি। নাক আর কানে তুলো গোঁজা অবস্থায় মেয়েকে খাটিয়াতে শোয়ানো দেখে কাঁদছে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে। কান্না বড় সংক্রামক ব্যাধি।

লাবণী বৌদির কান্না সংক্রমিত হয়েছে সকল বস্তিবাসীর চোখে। মানব চরিত্র বড়ই অদ্ভুত! মাত্র একদিন আগেও যে মেয়েটাকে বস্তির একটা মানুষও দেখতে পারত না, আড়ালে যাকে নিয়ে কানাঘুষো করত সবাই, সবার কাছে যে ছিল খারাপ একটা মেয়ে কেবল একদিনের ব্যাবধানে সেই মেয়েটার জন্যই চোখের জল ফেলছে সবাই। কাঁদছে না শুধু সূর্য। অপলক চোখে তাকিয়ে আছে রিতার লাশটার দিকে। বিকেলের মধ্যেই শেষকৃত্য সম্পন্ন গেল রিতা আর বিশুর মায়ের। শেষকৃত্য শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই সৃষ্টি খেতে দেয় সূর্যকে।

সৃষ্টি – খেয়ে নে বাবা, সারাদিন কিচ্ছুটি মুখে দিসনি।

কোনো কথা না বলে চুপচাপ সামান্য খেয়ে নেয় সূর্য। সারারাত বালিশে মাথা ঠেকিয়ে ভাবতে থাকে রিতার কথা। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিল জানে না ও। আজ অনেক ভোরে ঘুম ভেঙে যায় ওর। মনে হয় বুঝি পুরোটাই দুঃস্বপ্ন ছিল ওর। কিন্তু ওদের আধপোড়া ঘর দেখে ভুল ভাঙে। বাইরে এসে দেখে মা রান্না করছে। বাবা তখনও ঘুমাচ্ছে।

সৃষ্টি – কিরে এতো সকালে উঠলি যে আজ?

সূর্য – ঘুম ভেঙে গেল মা।

সৃষ্টি – জানিস একটা না অবাক কান্ড ঘটে গেছে।।

সূর্য – কি হয়েছে আবার?

সৃষ্টি – কারা যেন রাতের বেলায় চুপিচুপি এসে রিতাদের ঘরে এক লাখ টাকা রেখে গেছে।

কোনো কথা বলেনা সূর্য। গতকাল বিকেলে কাউন্সিলর সূর্যের পুড়ে যাওয়া ব‌ইখাতা কিনে দিয়েছিলেন। চুপচাপ হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসে যায় সূর্য। ছেলের এমন আকস্মিক পরিবর্তন দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সৃষ্টি। পড়াশোনা শেষ করে রেডি হয়ে ব্যাগ কাঁধে বেরোয় সূর্য। না আজ আর ও স্কুলে যাওয়ার ভান করছে না, সত্যি সত্যি স্কুলে যাবে সূর্য।

ব্যাগ কাঁধে ওদের আড্ডার জায়গাটা পার হওয়ার সময়েই দেখে কেমন অপরাধী মুখ করে বসে আছে ন্যাড়া আর ঘোঁতন। সূর্য না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিল, দৌড়ে এগিয়ে আসে ওরা।

ন্যাড়া – সূর্য দাঁড়া। শোন ভাই, বলে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়।

সূর্য – সামনে থেকে সরে যাও ন্যাড়াদা, স্কুলে যাচ্ছি আমি।

ঘোঁতন – বিশ্বাস কর ভাই, আমরা ইচ্ছা করে করিনি। একজন আমাদের বলেছিল পেট্রোল ঢেলে সমিতির ভাঙা ঘরটায় আগুন দিলে এক লাখ টাকা দেবে। আমরা বুঝিনি যে এমনটা হয়ে যাবে।

সূর্য – রাস্তা ছাড়ো ঘোঁতনদা। ভয় নেই, আমি তোমাদের কথা কাউকে বলিনি আর বলব‌ও না।

ন্যাড়া – (সূর্যর হাত চেপে ধরে) তুই সবাইকে বলে দে সূর্য, পুলিশ ডেকে আমাদের ধরিয়ে দে, কিন্তু তুই রাগ করে থাকিস না আমাদের উপর। আমরা না তোর বন্ধু!

সূর্য – হ্যাঁ আমিও এটাই জানতাম এতদিন যে তোমরা আমার বন্ধু। কিন্তু গতকাল আমার ভুল ভেঙে গেছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার, সরে যাও।

ঘোঁতন – সূর্য, ওই টাকার একটা টাকাও আমরা খরচ করিনি। পুরো এক লাখ টাকা রাতের বেলা থুয়ে এসেছি রিতাদের বাড়িতে।

সূর্য – (অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে) তা তোমাদের এক লাখ টাকা পেয়ে কি রিতা ফিরে এসেছে? অনেক নাটক করেছ তোমরা, এবার রাস্তা ছাড়ো।

সূর্যের চোখের দিকে তাকাতে পারে না ওরা। দুজনেই চোখ নামিয়ে নেয়। ন্যাড়া আর ঘোঁতনের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সূর্য এগিয়ে যায় সামনে। “সূর্য” বলে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে ন্যাড়া। ঘোতন‌ও ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলে, “থাক ন্যাড়া, যেতে দে ওকে। ওরা শালা ভদ্দরনোক। আমাদের মতো ছোটনোকের সঙ্গে ও আর মিশবে না।” ঘোঁতনের কথায় একবার থমকে দাঁড়ায় সূর্য। পরক্ষণেই মনে পড়ে রিতাকে দেওয়া কথা। না, ও আর এদের সঙ্গে মিশবে না। স্কুলে যাবে রোজ, ঠিকঠাক পড়াশোনা করবে। যেভাবেই হোক রিতাকে দেওয়া কথা ওকে রাখতেই হবে। দ্রুত পা চালিয়ে স্কুলের দিকে চলে যায় সূর্য।

…চলবে…