সময় নদীর মতো বয়ে যায়।
কলকাতায় অয়নের দিনগুলোও ধীরে ধীরে একটা নিয়মের ভেতর ঢুকে পড়তে লাগল। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসা, দুপুরে খাওয়া, বিকেলে আবার বই, রাতে কিছুক্ষণ বারান্দা—সবকিছু যেন বাইরে থেকে খুব সাধারণ।
কিন্তু সাধারণ দিনের ভেতরেও কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত জন্ম নেয়, যা মানুষের ভেতরকে অকারণে বদলে দিতে শুরু করে।
অয়নের জীবনেও তেমনই কিছু ঘটছিল।
সে নিজেকে বোঝাত— এই বাড়িতে সে পড়তে এসেছে। সঙ্গীতা তার বৌদি। তার প্রতি এতটা ভাবা ঠিক নয়।
কিন্তু মন কি যুক্তির খাতায় নাম লেখায়?
সকালে পড়ার টেবিলে বসে থাকলেও কখনো কখনো তার কান দরজার বাইরে চলে যেত। রান্নাঘরে বাসনের শব্দ, সঙ্গীতার পায়ের নরম আওয়াজ, দূর থেকে ভেসে আসা তার গলার স্বর—সব যেন আলাদা করে চিনে নিতে শুরু করেছে অয়ন।
সেই দুপুরেও সে পড়তে বসেছিল। বই খোলা, খাতা সামনে, কলম হাতে। কিন্তু অক্ষরগুলো মাঝে মাঝে স্থির থাকছিল না। মাথার ভেতর ঘুরে ফিরে আসছিল আগের দিনের কথা।
“তুমি খুব বিপজ্জনক কথা বলো, অয়ন।”
কথাটা সঙ্গীতা হাসতে হাসতেই বলেছিল, তবু তার ভেতরে যেন অদ্ভুত এক সতর্কতা ছিল। অয়ন বোঝে—সে সত্যিই বিপজ্জনক এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কারণ তার বলা কথাগুলো শুধু প্রশংসা ছিল না।
সেগুলো ছিল মনের খুব গভীর থেকে উঠে আসা সত্যি। রান্নাঘরে সঙ্গীতা ব্যস্ত ছিল।
আগে এই বাড়িতে দুপুরগুলো খুব নীরব কাটত। সূর্য অফিসে চলে গেলে ঘরটা তার নিজের হয়ে যেত, অথচ সেই নিজের ঘরই কখনো কখনো কারাগারের মতো লাগত। একা রান্না, একা খাওয়া, একা বই পড়া, একা ঘুমিয়ে পড়া—সবই যেন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন বাড়িতে আরেকজন আছে।
অয়ন।
ছেলেটা খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার উপস্থিতি ঘরের নীরবতাকে বদলে দিয়েছে। কেউ পড়ার টেবিলে বসে আছে—এই অনুভূতিটুকুই সঙ্গীতার কাছে অদ্ভুত শান্তির মতো লাগে। দুপুরে রান্না করতে করতে তার মনে হয়, কারও জন্য ভাত বেড়ে দেওয়া আছে, কারও জন্য চা বানাতে হবে, কারও পড়ার মাঝে জল দেওয়া দরকার।
এই ছোট ছোট কাজগুলোও কখন যেন তার নিঃসঙ্গ দুপুরে রঙ মিশিয়ে দিতে শুরু করেছে।
সঙ্গীতা নিজের মনে হেসে ফেলল।
তারপরই নিজেকে ধমক দিল।
“বেশি ভাবছিস, সঙ্গীতা।”
কিন্তু সে জানত, এই ভাবনাগুলোকে শুধু ধমক দিয়ে থামানো যাবে না। রান্না শেষ করে সে অয়নের ঘরের সামনে এসে ডাকল,
“অয়ন, স্নান করে নাও। খেতে দেব।”
অয়ন বই থেকে মুখ তুলে বলল,
“আচ্ছা, যাচ্ছি।”
সে উঠে বাথরুমে গেল।
সঙ্গীতা এই ফাঁকে বারান্দায় রাখা শুকনো কাপড়গুলো গুছিয়ে নিতে গেল। অয়নের ঘরের ছোট্ট বারান্দাটা দুপুরের আলোয় ভরে আছে। টবের গোলাপগাছে কুঁড়িটা আরও একটু বড় হয়েছে। সঙ্গীতা গাছটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“ফুটতে আর বেশি দেরি নেই,” সে নিজের মনেই বলল।
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলল।
সঙ্গীতা ঘুরতেই অয়নকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
অয়ন বুঝতে পারেনি সঙ্গীতা বারান্দায় আছে। স্নান সেরে বেরিয়েছে, কাঁধে তোয়ালে, ভেজা চুল কপালে লেগে আছে। মুখে এখনো জলের ফোঁটা। সাধারণ দৃশ্য, তবু আকস্মিক বলে দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
অয়নের চোখ বড় হয়ে গেল।
“বৌদি!”
সঙ্গীতা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“আমি… আমি কাপড় নিতে এসেছিলাম। তুমি আগে কাপড় পরে নাও।”
অয়ন প্রায় দৌড়ে আবার বাথরুমে ঢুকে দরজা টেনে দিল।
দরজার ওপাশ থেকে তার অপ্রস্তুত গলা শোনা গেল,
“আমি বুঝিনি তুমি আছো!”
সঙ্গীতার মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি ফুটল। ছেলেটার লজ্জা এমন নির্মল যে সেটাকে দেখে বিরক্ত হওয়া যায় না। বরং মনে হয়, পৃথিবীতে এখনো কিছু সরলতা বেঁচে আছে।
সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে, ভয় পেও না। আমি যাচ্ছি। কাপড় পরে খেতে এসো।”
ভেতর থেকে অয়ন বলল,
“আচ্ছা।”
সঙ্গীতা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
কিন্তু বেরিয়ে এসে তার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি রয়ে গেল। ঘটনাটা খুব ছোট, খুব সাধারণ—তবু কেন যেন অস্বস্তি আর মায়া একসঙ্গে মিশে গেল তার মধ্যে।
সে নিজেকে আবার বোঝাল—
“ছোট ছেলে। এসব ভাবার কিছু নেই।”
কিন্তু মন ভেতর থেকে প্রশ্ন করল—
“তাহলে এত অস্থির লাগছে কেন?” খাওয়ার টেবিলে অয়ন এসে বসতেই সঙ্গীতা বুঝল, ও এখনো লজ্জায় গুটিয়ে আছে।
সে ভাত বাড়ছিল। অয়ন মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ তুলছে না। এমনকি জল চাইতেও কেমন দ্বিধা করছে।
সঙ্গীতা মজা সামলাতে পারল না।
“কি দেড় মশাই, আজ এত চুপচাপ কেন?”
অয়ন মাথা তুলল না।
“কিছু না।”
“কিছু না? নাকি একটু আগে যা হলো, সেটার জন্য?”
অয়নের কান লাল হয়ে উঠল।
“বৌদি, ওটা ভুল করে হয়েছে।”
“আমি তো বলিনি ইচ্ছে করে হয়েছে।”
“তবু…”
“তবু কী?”
অয়ন এবার একটু বিরক্ত গলায় বলল,
“তুমি হাসছ কেন?”
সঙ্গীতা এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
“কারণ তোমাকে লজ্জা পেতে দেখতে ভালো লাগে।”
অয়ন মাথা তুলে তাকাল।
“এটা ভালো কথা হলো?”
“খুব ভালো কথা। আজকাল লজ্জা পায় এমন ছেলে কম দেখা যায়।”
অয়নের মুখ আরও গম্ভীর হলো।
“আমি কিন্তু এতটাও ছোট নই।”
কথাটা বলেই সে নিজে চুপ করে গেল।
সঙ্গীতাও থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
“ছোট নই”—এই কথাটা যেন হঠাৎ ঘরের ভেতর অন্য অর্থ নিয়ে ভেসে উঠল। দুজনেই তা বুঝল, কিন্তু কেউ মুখে আনল না।
সঙ্গীতা খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“তা জানি। কিন্তু আমার কাছে তুমি এখনো নতুন। তাই তোমাকে একটু খোঁচানো যায়।”
অয়ন আর কিছু বলল না।
খাওয়া শুরু করল।
কিন্তু সঙ্গীতা লক্ষ্য করল, সে সত্যিই তার দিকে তাকাতে পারছে না। এই অস্বস্তি, এই লজ্জা—সব মিলিয়ে অয়নের মুখে এমন এক কোমলতা ফুটে উঠেছে, যা সঙ্গীতাকে অকারণে নরম করে দিল।
সে প্লেটে ডাল দিতে দিতে বলল,
“আর রাগ করো না। খাও। আজ তোমার জন্য আলাদা করে ডিমের ঝোল করেছি।”
অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। কাকাবাবু বলেছিলেন তুমি ডিমের ঝোল পছন্দ করো।”
অয়নের মুখের গাম্ভীর্য একটু নরম হলো।
“তুমি মনে রেখেছ?”
“সব কথা কি ভুলে যাই?”
অয়ন আর উত্তর দিল না। কিন্তু তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য এমন কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল যে সঙ্গীতা তাকিয়ে থাকতে পারল না।
কেউ কারও প্লেটে শুধু খাবার দেয় না।
কখনো কখনো দেয় যত্ন।
আর যত্ন অনেক সময় ভালোবাসার প্রথম ভাষা হয়ে ওঠে। খাওয়ার পর অয়ন ঘরে ফিরে এল।
বই খুলে পড়তে বসার কথা, কিন্তু মন বারবার দুপুরের টেবিলে ফিরে যাচ্ছে।
“তোমার জন্য আলাদা করে ডিমের ঝোল করেছি।”
এই সাধারণ কথাটা তার বুকের মধ্যে অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
তার নিজের মা এভাবে মনে রাখে। ছোট বোন জানে সে কী খেতে ভালোবাসে। কিন্তু কলকাতার এই অচেনা বাড়িতে, মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে, সঙ্গীতা তার পছন্দ মনে রেখেছে—এটা অয়নকে স্পর্শ করল।
সে বুঝল, মানুষ কখন কার কাছে আপন হয়ে যায়, তার কোনো হিসেব নেই।
দুপুরের ক্লান্তি এসে গেল ধীরে ধীরে। অয়ন বইয়ের ওপর মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়ল, বুঝতেই পারল না। বিকেলে ঘুম ভাঙল দরজার নরম শব্দে।
“অয়ন?”
সে চোখ মেলল।
সঙ্গীতা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে।
“উঠবে? বিকেল হয়ে গেছে। চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
অয়ন তাড়াতাড়ি উঠে বসল।
“আমি আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?”
“হ্যাঁ। আর খুব সুন্দর করে পড়ছিলে।”
“মানে?”
“বইয়ের ওপর মাথা রেখে।”
অয়ন একটু লজ্জা পেল।
“আজকাল তুমি আমাকে খুব বেশি খোঁচাও।”
সঙ্গীতা হাসল।
“কারণ তুমি খুব সহজে খোঁচা খাও।”
অয়ন মুখ ধুয়ে এসে চায়ের কাপ হাতে নিল। আজ চায়ের সঙ্গে বিস্কুটও আছে। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। সঙ্গীতা খাটের পাশে বসে নিজের কাপ হাতে নিল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ চা খেল।
তারপর সঙ্গীতা বলল,
“সত্যি বলো তো, আজ দুপুরে এত লজ্জা পেলে কেন?”
অয়ন কাপে চোখ রেখে বলল,
“স্বাভাবিক না?”
“স্বাভাবিক। কিন্তু তোমার লজ্জাটা একটু আলাদা।”
“আলাদা মানে?”
“যেন তুমি ভুল করার আগেই ক্ষমা চাইতে চাও।”
অয়ন চুপ করল।
কথাটা যেন ঠিক জায়গায় গিয়ে লাগল।
সে ধীরে বলল,
“আমি কাউকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না।”
সঙ্গীতা এবার চুপ হয়ে গেল।
অয়ন বলল,
“কাউকে দেখে ভালো লাগতেই পারে। মানুষ সুন্দর জিনিস দেখলে তাকায়। কিন্তু সেই তাকানো যদি অন্য মানুষকে ছোট করে দেয়, অস্বস্তি দেয়, তাহলে সেটা ভুল।”
সঙ্গীতা কাপ নামিয়ে রাখল।
এই কথাটা সে অনেক পুরুষের মুখে শুনেনি। বরং জীবনে বহুবার সে দেখেছে, কিছু দৃষ্টি শরীরকে শুধু শরীর করে দেয়। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে, আত্মীয়দের ভিড়ে দাঁড়ালে, কোনো অনুষ্ঠানে গেলে—কিছু চোখ তাকে মানুষ হিসেবে নয়, শুধু শরীর হিসেবে মাপে।
অয়ন তার দিকে তাকায়। সে তা বোঝে।
কিন্তু অয়নের চোখে অদ্ভুত এক ভয় থাকে—সম্মান হারিয়ে ফেলবার ভয়। যেন সে দেখতে চায়, কিন্তু স্পর্শ করার আগেই অনুমতি চায়; মুগ্ধ হতে চায়, কিন্তু লালসা হতে ভয় পায়।
সঙ্গীতা আস্তে বলল,
“সবাই এমন ভাবে না।”
অয়ন তাকাল।
“কী?”
“এই যে তুমি বললে, কাউকে অস্বস্তি দেওয়া ঠিক না। সবাই এটা বোঝে না।”
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“সবাই না বুঝলেও, বোঝা উচিত।”
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু সঙ্গীতার মনে হলো, কেউ যেন তার বহুদিনের ক্লান্ত আত্মসম্মানে আলতো হাত রাখল।
সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কাছে সুখ মানে কী, অয়ন?”
অয়ন প্রশ্নটা শুনে একটু অবাক হলো।
“হঠাৎ?”
“বল না। শুনতে ইচ্ছে করছে।”
অয়ন চায়ের কাপে তাকাল। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সে বলল,
“সুখ মানে… খুব বড় কিছু না। যার জন্য মন কাঁদে, তার মুখে হাসি দেখা। নিজের কথা বলার জন্য একজন মানুষ পাওয়া। দিনের শেষে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, ‘খেয়েছ?’—সেটাও সুখ। কেউ যদি মনে রাখে আমি ডিমের ঝোল পছন্দ করি—সেটাও সুখ।”
শেষ কথাটা শুনে সঙ্গীতা তাকাল তার দিকে।
অয়ন এবার একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
“মানে… উদাহরণ দিলাম।”
সঙ্গীতা ধীরে হাসল।
“বুঝলাম।”
অয়ন আবার বলল,
“আর সুখ মানে এমন একটা মানুষ, যার সামনে নিজের দুর্বলতাও লুকোতে হয় না।”
সঙ্গীতা এবার আর হাসল না।
তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
সে মনে মনে ভাবল— তার জীবনে কি এমন কেউ আছে?
সূর্যের সামনে সে কি দুর্বল হতে পারে? কাঁদতে পারে? অভিমান করতে পারে? নাকি সবসময় শুধু পরিপাটি স্ত্রী হয়ে থাকতে হয়?
কথা অন্যদিকে ঘোরাতে সে বলল,
“তোমার কথা শুনলে মনে হয় তুমি প্রেম করলে খুব বিপদ হবে।”
অয়ন অবাক হলো।
“কেন?”
“কারণ তুমি প্রেমকে খুব সিরিয়াসলি নাও।”
“প্রেম সিরিয়াস জিনিস না?”
“সবাই নেয় না।”
“তুমি নেবে?”
প্রশ্নটা বেরিয়ে যেতেই দুজনেই থেমে গেল।
ঘরে এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল।
সঙ্গীতার চোখে অদ্ভুত এক ছায়া ভেসে উঠল। সে উত্তর দিল না। শুধু কাপটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“তুমি পড়ো। কাপটা পরে নিয়ে যাব।”
অয়ন বুঝল, সে সীমার খুব কাছে গিয়ে ফেলেছে।
“সরি,” সে আস্তে বলল।
সঙ্গীতা দরজার কাছে গিয়ে থামল।
“সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে নেই, অয়ন।”
তারপর একটু হেসে যোগ করল,
“কিছু উত্তর সময় নিজেই দিয়ে দেয়।”
সে চলে গেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।
অয়ন বই খুলে বসে আছে, কিন্তু তার মন পড়ায় নেই। বারবার মনে পড়ছে সেই প্রশ্ন—
“তুমি নেবে?”
কেন সে এমন প্রশ্ন করল? সঙ্গীতা বিবাহিত। সে তার দাদার স্ত্রী। এই সম্পর্কের মধ্যে এমন কোনো প্রশ্নের জায়গাই নেই।
তবু প্রশ্নটা উঠে এসেছিল।
কারণ কোথাও না কোথাও সে জানতে চাইছিল—সঙ্গীতা কি কখনো ভালোবাসাকে সত্যি করে ভাবতে চায়? শুধু দায়িত্ব নয়, শুধু সংসার নয়, শুধু নাম নয়—ভালোবাসা?
অয়ন মাথা ঝাঁকাল।
“না। এভাবে ভাবলে চলবে না।”
সে বইয়ের দিকে মন দিল।
কিন্তু মন জানে, যাকে সরাতে চাওয়া হয়, সে-ই সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে। রাতে সূর্য ফিরল বেশ দেরিতে।
অয়ন তখন ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। সঙ্গীতা খাবার গরম করছে। সূর্য দরজা খুলে ঢুকেই ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিজের ঘরে চলে গেল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কাল মিটিংটা shift করে দাও… না, আমি দেখে নিচ্ছি…”
সঙ্গীতা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বলল,
“চা দেব?”
সূর্য ফোন কানে রেখেই বলল,
“না, লাগবে না। খেতে দাও তাড়াতাড়ি। খুব ক্লান্ত।”
সঙ্গীতা চুপচাপ রান্নাঘরে ফিরে গেল।
অয়ন দৃশ্যটা দেখল।
খুব ছোট দৃশ্য।
কিন্তু তাতে একটা দীর্ঘ অভ্যাসের ছাপ ছিল। যেন সঙ্গীতার প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজনের বাইরে যায় না। চা লাগবে কি না, খাবার গরম কি না, জামা কোথায়—এই পর্যন্ত। তার মন কেমন, সে অপেক্ষা করছিল কি না—সেসব যেন এই সংসারের ভাষা নয়।
খাওয়ার সময় সূর্য অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোচিংয়ের ব্যাপারে কাল একটা ফোন করব। তোর admission হয়ে যাবে।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে দাদা।”
“পড়াশোনা ছাড়া অন্যদিকে মন দিবি না। শহর নতুন, কিন্তু distraction অনেক।”
কথাটা সাধারণ উপদেশ ছিল। তবু অয়নের বুক কেঁপে উঠল।
সে চোখ নামিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বুঝেছি।”
সঙ্গীতা ভাত বাড়ছিল। এক মুহূর্তের জন্য তার হাত থেমে গেল। তারপর আবার স্বাভাবিক হলো।
সূর্য সেটা খেয়াল করল না।
অয়ন করল। রাত গভীর হলে সঙ্গীতা নিজের ঘরে বই খুলে বসেছিল।
পাতা সামনে, কিন্তু মন পড়ায় নেই।
আজ অয়নের কথাগুলো তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। “সুখ মানে কী?” “তুমি নেবে?”
সে জানে, অয়ন হয়তো ইচ্ছে করে বলেনি। কিন্তু কিছু কথা ইচ্ছে না করেও মানুষের ভিতরে ঢুকে যায়। অনেক বছর ধরে বন্ধ থাকা জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢোকার মতো।
সূর্য পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্লান্ত শরীর, নিয়মিত শ্বাস। সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটি তার স্বামী।
তবু কেন তার পাশে শুয়েও সে একা?
এই প্রশ্নের উত্তর সে অনেকদিন এড়িয়ে গেছে। আজ পারল না।
সে চুপচাপ উঠে বারান্দায় এল।
বাইরে রাত। শহর ঘুমোয় না, শুধু শব্দ কমিয়ে দেয়। দূরে আলো, কোথাও কুকুরের ডাক, কোথাও দেরিতে ফেরা গাড়ির শব্দ।
সঙ্গীতা বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে দাঁড়াল।
ঠিক পাশের ছোট্ট বারান্দায় অয়নও দাঁড়িয়ে আছে—এটা সে আগে খেয়াল করেনি।
অয়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সঙ্গীতার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকাল।
“ঘুমাওনি?”
সঙ্গীতা মাথা নেড়ে বলল,
“না। ঘুম আসছিল না।”
“আমারও না।”
দুজনেই মৃদু হেসে ফেলল।
নীরবতা নেমে এল।
আগের রাতের মতোই, কিন্তু আজ সেই নীরবতার ভেতর অন্যরকম ঘনত্ব। যেন দুজনেই অনেক কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দের সামনে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
অয়ন আস্তে বলল,
“আজ একটা কথা বেশি বলে ফেলেছিলাম।”
সঙ্গীতা জানত কোন কথা। তবু জিজ্ঞেস করল,
“কোনটা?”
“তুমি প্রেমকে সিরিয়াসলি নেবে কি না।”
সঙ্গীতা আকাশের দিকে তাকাল।
“হয়তো প্রশ্নটা ভুল ছিল না।”
অয়ন তাকিয়ে রইল।
সঙ্গীতা বলল,
“আমি শুধু উত্তর জানি না।”
অয়নের বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে গেল।
সে আর কিছু বলল না।
সঙ্গীতা ধীরে বলল,
“জীবনে অনেক সময় মানুষ এমন পথে হাঁটে, যেটা সে নিজে বেছে নেয়নি। তারপর একদিন কেউ এসে জিজ্ঞেস করে—তুমি সত্যিই এটাই চেয়েছিলে? তখন ভয় লাগে।”
“কেন?”
“কারণ উত্তরটা যদি ‘না’ হয়?”
অয়ন চুপ করে গেল।
রাতের বাতাসে দুজনের নীরবতা আরও গভীর হলো।
দূরে কোথাও হালকা বাতাসে শুকনো পাতা নড়ল। বারান্দার গোলাপগাছের কুঁড়িটা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে।
সঙ্গীতা সেটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখেছ? কুঁড়িটা বড় হচ্ছে।”
অয়ন বলল,
“হ্যাঁ। কয়েকদিনের মধ্যে ফুটবে।”
“ফুল ফুটলে জানাবে কিন্তু।”
“তুমি নিজেই তো দেখবে।”
সঙ্গীতা মৃদু হেসে বলল,
“সবকিছু কি নিজে দেখা যায়? কিছু কিছু জিনিস কেউ দেখিয়ে দিলে তবেই চোখে পড়ে।”
অয়ন বুঝল না কথাটা শুধু ফুলের জন্য, না অন্য কিছুর জন্য।
তারপর সঙ্গীতা বলল,
“যাও, ঘুমাও। কাল তোমার অনেক পড়া।”
অয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“তুমিও।”
সঙ্গীতা ঘুরে গেল। দরজার কাছে গিয়ে একবার থামল।
“অয়ন…”
“হ্যাঁ?”
“আজকের চায়ের কথা মনে থাকবে?”
অয়ন অবাক হলো।
“কেন?”
“এমনি। কিছু কিছু দুপুর মনে রাখতে হয়।”
বলেই সে চলে গেল।
অয়ন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ।
রাতের কলকাতা দূরে জ্বলছিল। ঘরের ভেতর তার বই খোলা পড়ে আছে। কিন্তু আজ আর পড়া হলো না।
তার মনে হচ্ছিল, একটা অদৃশ্য দরজা একটু খুলেছে।
পুরোটা নয়।
শুধু একটু।
কিন্তু সেই ফাঁক দিয়েই আলো ঢুকতে শুরু করেছে।
অয়ন জানত না, এই আলো একদিন আগুন হয়ে উঠবে।
আর সঙ্গীতা জানত না, যে প্রশ্নের উত্তর আজ সে জানে না—একদিন সেই উত্তরই তাকে নিজের জীবন থেকে পালাতে নয়, নিজের জীবনে ফিরে যেতে শেখাবে।
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।