কলেজ স্ট্রিটের বৃষ্টির পরের সকালটা অয়নের কাছে অদ্ভুত লাগছিল। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই তার চোখ গেল টেবিলে সাজানো নতুন বইগুলোর দিকে। বইগুলো কাল রাতেই সে যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছিল—বিষয় অনুযায়ী আলাদা, খাতাগুলো এক পাশে, কলম আর পেন্সিল আরেক পাশে। সবকিছু ঠিকঠাক। পড়ার জন্য প্রস্তুত। তবু মন অদ্ভুতভাবে অস্থির। বই খুললেই অক্ষরের বদলে ভেসে উঠছে বৃষ্টিভেজা কলেজ স্ট্রিট। পুরোনো বইয়ের গন্ধ। ছোট্ট চায়ের দোকান। সঙ্গীতার ঠোঁটে লেগে থাকা চায়ের ফোঁটা। ট্যাক্সির হঠাৎ ব্রেক। হাতের তালুতে লেগে থাকা সেই নরম উষ্ণতা। অয়ন চোখ বন্ধ করল। “না। আজ পড়ায় মন দিতে হবে।” সে নিজের মনে বলল। কিন্তু মন যেন আজ অবাধ্য ছাত্র। যতই শাসন করো, সে বারবার একই জানালার বাইরে তাকায়। জানালার ওপারে ছিল সঙ্গীতা।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল মশলা ফোড়নের গন্ধ। সঙ্গীতা সকাল থেকেই কাজে ব্যস্ত। কলেজ স্ট্রিটে যাওয়ার পর শরীর একটু ক্লান্ত, তবু কাজ তো থেমে থাকে না। এই বাড়িতে তার ক্লান্তির জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। ভাত বসাতে হবে, ডাল গরম করতে হবে, সূর্যের টিফিনের বাক্স ধুতে হবে, অয়নের জন্য চা করতে হবে। সব কাজের মাঝেও তার মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল গতকালের সেই বৃষ্টির বিকেলে। “আমি চেনা?” “হতে শুরু করেছ।” এই কথাটুকু যেন সারারাত তার বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে বাজতে থেকেছে। সঙ্গীতা নিজেকে অনেকবার বোঝাতে চেয়েছে—এগুলো কিছু না। অয়ন নতুন এসেছে, অচেনা শহরে সে কাউকে আপন ভাবছে, তাই এমন কথা বলছে। আর সে? সে তো শুধু দায়িত্ব নিয়েছে। একজন ছোট ছেলের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া, শহরের পথ চিনিয়ে দেওয়া—এই পর্যন্তই। কিন্তু মনের ভেতর আরেকটা গলা বলছিল— “শুধু দায়িত্ব হলে কেন সেই স্পর্শ এখনো মনে আছে?” সঙ্গীতা চামচ থামিয়ে দিল। হাতের কাজ থেমে গেলে মন আরও জোরে কথা বলে। তাই সে দ্রুত আবার কাজে মন দিল। ঠিক তখনই অয়নের ঘর থেকে কাশি শোনা গেল। সে নিজেকে সামলে বলল, “অয়ন, চা দেব?” ঘর থেকে অয়নের গলা এল, “দেবে? খুব দরকার।” সঙ্গীতা নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। “চা না হলে পড়াশোনা হয় না, তাই তো?” অয়ন দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। “এটা এখন প্রমাণিত সত্যি।” সঙ্গীতা কাপ নামাতে নামাতে বলল, “তাহলে তোমার ফল খারাপ হলে দায় আমার?” “না, ফল ভালো হলে কৃতিত্ব তোমার।” “বেশ। কথা লিখে রাখলাম।” অয়ন হাসল। এই ছোট্ট কথাবার্তাগুলো এখন ঘরের সকালকে একটু আলাদা করে দেয়। সঙ্গীতার মনে হয়, বাড়িতে যেন মানুষের শব্দ আছে। শুধু বাসন, দরজা, ফোন, laptop—এসবের শব্দ নয়। সত্যিকারের মানুষের শব্দ। সে কাপটা অয়নের হাতে দিল। অয়নের আঙুল কাপ নিতে গিয়ে সঙ্গীতার আঙুল ছুঁয়ে গেল। খুব সামান্য, কিন্তু দুজনেই সেই স্পর্শ টের পেল। সঙ্গীতার শরীরে একটা ছোট শিহরণ খেলে গেল। অয়নের হাতও এক মুহূর্ত থেমে গেল, যেন কাপটা নেওয়ার কথা ভুলে গেছে। দুজনেই কিছু বলল না। সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে নিল। অয়ন কাপ হাতে নিয়ে ঘরে ফিরল। সকালের আলো আরও একটু নরম হয়ে এল।
দুপুরের দিকে সূর্য অফিস থেকে ফোন করল। সঙ্গীতা তখন খাবার গরম করছে। ফোনটা টেবিলে কাঁপতে দেখে সে দ্রুত ধরল। “হ্যালো?” ওপাশে সূর্যের গলা। “শোনো, আজ রাতে আমার ফিরতে দেরি হবে। একটা client dinner আছে।” সঙ্গীতা শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা। খেয়ে আসবে?” “হ্যাঁ, সম্ভবত। তুমি অপেক্ষা কোরো না।” “ঠিক আছে।” কথা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সূর্য যেন কিছু মনে করে আবার বলল, “আর হ্যাঁ, মা আজ তোমাকে ফোন করতে পারে। কথা বলো। ও আবার কিছু বললে মন খারাপ কোরো না।” সঙ্গীতা থেমে গেল। “কিছু বললে মানে?” ওপাশে সূর্য বিরক্ত গলায় বলল, “এই তো, ওই একই কথা। তুমি জানোই তো মা কেমন। বাচ্চার ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করে। ওর বয়স হয়েছে, নাতি-নাতনি দেখতে চায়। খুব সিরিয়াসলি নিও না।” সঙ্গীতার হাতে থাকা চামচ স্থির হয়ে গেল। “তুমি কি একবারও ওকে বলতে পারো না, এসব কথা আমাকে না বলতে?” সূর্য একটু বিরক্ত হলো। “আরে, মা-কে সব বলা যায় নাকি? আর ভুল কী বলছে? বিয়ের এত বছর হয়ে গেল। ওর চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক।” সঙ্গীতার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। “চিন্তা আর দোষ দেওয়া এক জিনিস না, সূর্য।” “আচ্ছা আচ্ছা, এখন অফিসে আছি। পরে কথা বলব।” লাইন কেটে গেল। সঙ্গীতা ফোনটা নামিয়ে রাখল। রান্নাঘরের আগুন জ্বলছে। ডাল ফুটছে। ঘর আগের মতোই আছে। কিন্তু তার ভেতর যেন কেউ একটা পুরোনো ক্ষত ছুঁয়ে দিল। অয়ন নিজের ঘরে পড়ছিল। ফোনের পুরো কথা সে শুনতে পায়নি, কিন্তু সঙ্গীতার গলার বদলে যাওয়া স্বর তার কানে এসেছিল। সে বইয়ের ওপর চোখ রেখেও পড়তে পারল না।
বিকেল নামার একটু আগে ফোনটা আবার বেজে উঠল। সঙ্গীতা নাম দেখে বুঝল—শাশুড়ি। এক মুহূর্ত সে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। ধরবে কি ধরবে না? না ধরলে পরে আরও কথা শুনতে হবে। ধরলে যা শোনার, সেটাই শুনতে হবে। শেষে সে ফোন ধরল। “নমস্কার মা।” ওপাশ থেকে কর্কশ অথচ মায়ার মুখোশ পরা গলা ভেসে এল। “কেমন আছো?” “ভালো।” “ভালো তো থাকবেই। তোমার আর কষ্ট কী! বাড়িতে বসে থাকো, খাও-দাও, বই পড়ো। সংসারে কোনো অভাব নেই।” সঙ্গীতা চুপ করে রইল। এই ধরনের কথার উত্তর দেওয়া যায় না। কারণ উত্তরে যুক্তি থাকে, আর অভিযোগের ভেতর যুক্তির জায়গা থাকে না। ওপাশের গলা আবার বলল, “শোনো, কাল ওঝা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। উনি বললেন, কিছু পুজো করলে নাকি ফল মিলতে পারে। তোমার কুণ্ডলীও আবার দেখাতে হবে।” সঙ্গীতা আস্তে বলল, “মা, ডাক্তার তো বলেছিলেন—” “ডাক্তার ডাক্তার করো না তো!” গলা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “সবকিছু ডাক্তার বোঝে? আমাদের সময় এত ডাক্তার ছিল? তবু ঘরে ঘরে বাচ্চা হতো।” সঙ্গীতা চোখ বন্ধ করল। ওপাশে আবার কথা চলল, “সত্যি কথা বলতে কী, মেয়েদের শরীরেই আজকাল কত সমস্যা। খাওয়া-দাওয়া ঠিক না, নিয়ম নেই। আর বয়সও তো কম হচ্ছে না তোমার।” সঙ্গীতার মুখ শুকিয়ে গেল। “মা…” “আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু ভাবো তো, সূর্যরও তো একটা জীবন আছে। ছেলে মানুষ। তারও তো বংশ চলার আশা আছে। আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব?” এইবার সঙ্গীতার চোখ জলে ভরে উঠল। সে খুব কষ্ট করে বলল, “আমি কি চেষ্টা করছি না?” ওপাশে সামান্য নরম হওয়ার বদলে আরও ভারী দীর্ঘশ্বাস এল। “চেষ্টা করলে তো ফল দেখা যায় মা। যাক, কাল একটা জায়গায় যাবে। আমি ঠিকানা পাঠাচ্ছি। পুজো করিয়ে নাও।” সঙ্গীতা আর কথা বলতে পারল না। “আচ্ছা,” বলেই ফোন কেটে দিল। তারপর কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে রইল। চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। কাঁদারও একরকম অভ্যাস হয়ে যায়। এমনভাবে কাঁদা, যাতে কেউ শুনতে না পায়।
অয়ন দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে সব শুনেছে কি না—তা সঙ্গীতা জানে না। কিন্তু যখন মুখ তুলে দেখল, অয়ন দাঁড়িয়ে আছে, তার বুকের ভেতর লজ্জা, অপমান, রাগ—সব একসঙ্গে উঠে এল। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছল। “তুমি এখানে?” অয়ন আস্তে বলল, “জল চাইছিলাম।” মিথ্যে। দুজনেই বুঝল। তবু সঙ্গীতা সেই মিথ্যেটার আশ্রয় নিল। “ও। দাঁড়াও, দিচ্ছি।” সে গ্লাসে জল ঢালতে গেল, কিন্তু হাত কাঁপছিল। গ্লাসে জল উপচে পড়ল। অয়ন এগিয়ে এসে গ্লাসটা ধরে দিল। তার আঙুল সঙ্গীতার হাতের পিঠ ছুঁয়ে গেল। স্পর্শটা খুব সামান্য, কিন্তু এইবার দুজনের কেউই সেটাকে অস্বীকার করতে পারল না। সঙ্গীতার কাঁপা হাত আরও এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল অয়নের আঙুলের নিচে। অয়নের চোখ চলে গেল সেই হাতের দিকে—একটা ঘরের সমস্ত কাজের ক্লান্তি, অপমান চাপা দেওয়ার অভ্যাস, আর অদ্ভুত কোমলতা যেন একসঙ্গে জমে আছে সেই হাতে। সঙ্গীতা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। “সব শুনেছ?” অয়ন চুপ করে রইল। চুপ করাটাই উত্তর। সঙ্গীতা মাথা নিচু করল। “খুব খারাপ লাগছে না? একটা বাড়ির বউকে এভাবে কথা শুনতে?” অয়ন নরম গলায় বলল, “খারাপ লাগছে। কিন্তু তোমার জন্য।” সঙ্গীতা তাকাল। অয়নের চোখে করুণা নেই। বিচার নেই। আছে শুধু ব্যথা। যেন তাকে অপমান করা হলে অয়নের নিজের ভেতরেও কোথাও লাগে। এই দৃষ্টি সঙ্গীতাকে আরও দুর্বল করে দিল। সে হেসে ফেলতে চাইল, কিন্তু গলায় কান্না আটকে গেল। “সবাই ভাবে দোষ আমার। কারণ আমি মা হতে পারিনি।” অয়ন বলল, “সবাই ভাবলেই কি সত্যি হয়ে যায়?” “সংসারে অনেক সময় সত্যি না, দোষটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।” অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “ডাক্তার কী বলেছিলেন?” প্রশ্নটা শুনে সঙ্গীতা থমকাল। “তুমি কেন জানতে চাইছ?” “কারণ তোমাকে একা দোষ নিতে দেখে ভালো লাগছে না।” সঙ্গীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ডাক্তার বলেছিলেন দুজনেরই আরও test দরকার। কিন্তু সূর্য আর যেতে চায়নি। বলল, এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার নেই। সময় হলে হবে।” “তারপর?” “তারপর সব কথা আস্তে আস্তে আমার ওপর এসে পড়ল। শাশুড়ি সরাসরি বলে না সবসময়। কিন্তু কথার মধ্যে বুঝিয়ে দেয়। সূর্যও চুপ থাকে।” অয়ন মুঠো বাঁধল। “চুপ থাকা অনেক সময় দোষ দেওয়ার মতোই।” সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল তার দিকে। এই কথাটা কেউ কোনোদিন তার হয়ে বলেনি। সে আস্তে বলল, “তুমি এসব বোঝো কীভাবে?” অয়ন হালকা হাসল না। আজ তার মুখ খুব গম্ভীর। “দুঃখ বুঝতে বয়স লাগে না।” সঙ্গীতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে রান্নাঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। “আমি খুব ক্লান্ত, অয়ন। কাউকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত যে আমি ইচ্ছে করে কিছু আটকে রাখিনি। আমি মা হতে চাই না এমন না। কিন্তু সবাই যেন ধরে নিয়েছে, আমার শরীরই দোষী। আমার মন, আমার লজ্জা, আমার ভয়—এসব কারও দরকার নেই।” অয়ন এক পা এগোল। খুব বেশি নয়, শুধু এতটা যাতে তার উষ্ণতা সঙ্গীতা টের পায়। “আমার দরকার আছে।”
সঙ্গীতা স্থির হয়ে গেল। দুজনের মাঝখানে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল। অয়ন যেন নিজের কথাটা বুঝতে পেরে একটু থামল। তারপর নরম গলায় বলল, “মানে… তোমার কথা শুনতে চাই। তুমি চাইলে।” সঙ্গীতা চোখ মুছল। কিন্তু কান্না থামল না। “কেউ এতদিন শুনতে চায়নি।” অয়ন আরও এক পা এগোল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সে বুঝেছে, সব কষ্টের সামনে হাত বাড়ানো যায় না। কখনো শুধু পাশে দাঁড়ালেই মানুষ বুঝে যায়—সে একা নয়। “এখন চাইছে,” অয়ন বলল। সঙ্গীতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো এই মুহূর্তে অয়ন কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবু সঙ্গীতার মনে হলো, বহুদিন পরে কেউ তার ভাঙা কথাগুলোর পাশে বসতে রাজি হয়েছে। এটাই কি আশ্রয়?
সন্ধ্যা নামল অদ্ভুত ভার নিয়ে। সঙ্গীতা নিজেকে সামলে রান্না শেষ করল। অয়ন সাহায্য করতে চাইল, কিন্তু সঙ্গীতা খুব শান্তভাবে বলল, “না, আমি পারব।” অয়ন জোর করল না। কারণ সে বুঝেছে—সব সাহায্য হাত বাড়িয়ে করা যায় না। কখনো পাশে চুপ করে দাঁড়ানোও সাহায্য। রাতে সূর্য ফোন করল। “আমি dinner করে ফিরব। তোমরা খেয়ে নিও।” সঙ্গীতা বলল, “ঠিক আছে।” “মা ফোন করেছিল?” “হ্যাঁ।” “কী বলল?” সঙ্গীতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। “যা বলে সবসময়।” সূর্য বিরক্ত গলায় বলল, “তুমি আবার মন খারাপ কোরো না। মা তো বয়স্ক মানুষ।” “বয়স্ক মানুষ হলে কি যা খুশি বলা যায়?” “আচ্ছা, এখন এসব নিয়ে ঝগড়া কোরো না। আমি বাইরে আছি।” সঙ্গীতা ফোন কেটে দিল না। কিন্তু তার গলা ঠান্ডা হয়ে গেল। “ঝগড়া আমি করছি না, সূর্য। শুধু একদিন চাই, তুমি আমার পাশে দাঁড়াও।” ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সূর্য বলল, “সবসময় emotional হলে সংসার চলে না, সঙ্গীতা।” লাইন কেটে গেল। সঙ্গীতা ফোন নামিয়ে রাখল। অয়ন ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। সে কথা শুনেছে। এবার আর লুকোনোর কিছু নেই। সঙ্গীতা খুব শান্ত মুখে বলল, “খেতে বসো।” অয়ন বলল, “তুমি?” “আমি পরে খাব।” “না। একসঙ্গে খাই।” সঙ্গীতা তাকাল। “তোমার পড়া আছে।” “খেতে পাঁচ মিনিট লাগে।” “তুমি খুব জেদি।” “কখনো কখনো।” সঙ্গীতা আর না বলল না। দুজন ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে লাগল। খাওয়ার সময় খুব বেশি কথা হলো না। কিন্তু আজ প্রথমবার সঙ্গীতার মনে হলো, কেউ তার খাওয়ার অপেক্ষা করছে। কেউ তার প্লেটে ডাল কম হলে খেয়াল করছে। কেউ জিজ্ঞেস করছে না—“লবণ কম কেন?” বরং চুপচাপ পাশে বসে আছে। এই পাশে থাকাটাই তাকে কাঁদিয়ে দিতে পারত, যদি সে নিজেকে সামলাতে না পারত।
রাত অনেক পরে, বাসন ধোয়া শেষ করে সঙ্গীতা বারান্দায় এল। আজ আকাশে মেঘ নেই। বাতাসও খুব বেশি নেই। শহর নিচে ধীরে ধীরে স্তিমিত। দূরে কোথাও আলো জ্বলছে, কোথাও নিভছে। অয়ন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল না। সঙ্গীতা একটু অবাক হলো। প্রায় প্রতিদিনই তো সে থাকে। সে গোলাপগাছটার দিকে তাকাল। কুঁড়িটা আরও ফুলে উঠেছে। হয়তো কালই ফুটবে। ঠিক তখনই পাশে অয়নের ঘর থেকে দরজা খোলার শব্দ। অয়ন বেরিয়ে এল। “তুমি?” সঙ্গীতা মৃদু হাসল। “আজ তোমাকে আগে পাইনি।” অয়ন বলল, “ভাবছিলাম, আজ তোমার একা থাকতে ইচ্ছে করবে।” “তাই আসোনি?” “হ্যাঁ।” সঙ্গীতার বুকের ভেতর কিছু নরম হয়ে গেল। “আর যদি একা থাকতে ইচ্ছে না করত?” অয়ন তাকাল। “তাহলে ডাকতে।” “সবাই ডাকতে পারে না, অয়ন।” অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “তাহলে আমি থাকব। না ডাকলেও।” এই কথার পর বাতাস যেন একটু থেমে গেল। সঙ্গীতা রেলিংয়ে হাত রাখল। বাতাসে তার চুল উড়ছিল। অয়নের চোখ বারবার তার গাল, ঠোঁট আর গলার নরম বাঁকে চলে যাচ্ছিল। সঙ্গীতা ধীরে বলল, “আজ খুব লজ্জা লাগছিল।” “কেন?” “তুমি আমার এত ব্যক্তিগত কথা শুনে ফেলেছ।” “ব্যক্তিগত কথা শুনে ফেলেছি বলে যদি তোমার কষ্ট কমে একটু, তাহলে আমি অপরাধী হতে রাজি।” সঙ্গীতা তাকাল তার দিকে। “তুমি সবসময় এভাবে কথা বলো কেন?” “কীভাবে?” “যেন কথা দিয়ে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।” অয়ন উত্তর দিল না। কারণ সে জানে না, সে কীভাবে কথা বলে। সে শুধু জানে, সঙ্গীতাকে কাঁদতে দেখলে তার ভেতরে কিছু ভেঙে যায়। সঙ্গীতা ধীরে বলল, “আজ মনে হচ্ছিল, আমি খুব ছোট হয়ে গেছি। সবাই আমাকে শুধু একটা অক্ষম শরীর হিসেবে দেখছে।” অয়নের গলা দৃঢ় হলো। “তুমি অক্ষম নও, সঙ্গীতা।” সে প্রথমবার শুধু নাম ধরে ফেলল। কথাটা বেরিয়ে যেতেই দুজনেই থেমে গেল। প্রথমবার নাম ধরে ডাকায় সঙ্গীতার শরীরে একটা কাঁপুনি উঠল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। যেন এতদিন পরে নিজের নামটা সে সত্যি করে শুনল। অয়নের মুখে অপরাধবোধ এল। “সরি… আমার মানে—” সঙ্গীতা তাকে থামাল না। বরং নামটা শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি উঠল। সঙ্গীতা। কতদিন পরে কেউ এই নামটা এমনভাবে বলল? স্বামীর মুখে সে “শোনো”, “এই”, “তুমি”। শাশুড়ির কাছে সে “বউমা”। সমাজের কাছে “সূর্যের স্ত্রী”। কিন্তু অয়নের মুখে সে শুধু—সঙ্গীতা। সে খুব ধীরে বলল, “আরেকবার বলো।” অয়ন হতভম্ব। “কী?” “আমার নাম।” অয়নের গলা ভারী হয়ে গেল। সে খুব আস্তে বলল, “সঙ্গীতা।” নামটা শুনে সঙ্গীতার শরীর গরম হয়ে উঠল। সে চোখ বন্ধ করল। নামের ভেতরেও যে স্পর্শ থাকে, তা সে আজ বুঝল। অয়ন বলল, “তুমি শরীর নও, সঙ্গীতা।” সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল। বারান্দার অন্ধকারে দুজনের নিঃশ্বাস একটু দ্রুত হয়ে উঠছিল। অয়ন বলল, “তুমি শুধু এমন মানুষদের মধ্যে আটকে গেছ, যারা তোমাকে পুরোটা দেখতে জানে না।” সঙ্গীতার চোখ ভিজে উঠল। “তুমি দেখো?” প্রশ্নটা এত নরম ছিল যে অয়ন উত্তর দিতে ভয় পেল। সে বলল, “দেখার চেষ্টা করি।” সঙ্গীতা মৃদু হেসে বলল, “সবাই চেষ্টা করে না।” দুজনেই চুপ করে গেল। রাতের আকাশ স্থির। গোলাপগাছের কুঁড়ি নিঃশব্দে ফুটে ওঠার অপেক্ষায়।
কিছুক্ষণ পর সঙ্গীতা বলল, “অয়ন, একটা কথা বলব?” “বল।” “আজ তুমি যদি রান্নাঘরে না আসতে… আমি হয়তো একাই কেঁদে নিতাম। তারপর মুখ ধুয়ে সব আগের মতো করে দিতাম। যেমন সবসময় করি।” “আর আজ?” “আজ মনে হলো, কেউ দেখেছে। আর সেই দেখাটা আমাকে ছোট করেনি।” অয়নের বুক ভারী হয়ে এল। “আমি কোনোদিন তোমাকে ছোট করব না।” সঙ্গীতা তাকিয়ে রইল। এই প্রতিশ্রুতির কোনো সামাজিক নাম নেই। কোনো অধিকার নেই। কোনো সম্পর্কের ছাপ নেই। তবু এই কথাটা তার ভেতরে এমনভাবে ঢুকে গেল, যেন বহুদিনের শূন্য ঘরে কেউ প্রথম প্রদীপ জ্বালল। সে বলল, “তুমি থাকলে আমার একা লাগে না।” অয়নের শ্বাস থেমে গেল প্রায়। এই কথাটা সে আশা করেনি। সঙ্গীতা যেন নিজের বলা কথায় নিজেই চমকে উঠল। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। “মানে… এই বাড়িতে তুমি আছ বলে একটু প্রাণ লাগে।” অয়ন খুব আস্তে বলল, “আমি থাকব।” “কতদিন?” প্রশ্নটা হঠাৎ বেরিয়ে গেল। অয়ন উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে তো পড়াশোনার জন্য এসেছে। একদিন হয়তো নিজের পথে চলে যাবে। এই বাড়ি, এই বারান্দা, এই চায়ের কাপ—সব পিছনে পড়ে থাকবে। কিন্তু সেদিনের কথা ভাবতেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো। সে বলল, “যতদিন দরকার।” সঙ্গীতা তাকাল না। শুধু বলল, “সব দরকারের মেয়াদ থাকে।” অয়ন বলল, “সব সম্পর্কের থাকে না।” আবার নীরবতা। এইবার নীরবতা একটু বিপজ্জনক। তারা দুজনেই বুঝল, কথা অন্য পথে যাচ্ছে। সঙ্গীতা নিজেকে সামলে বলল, “অনেক রাত হয়েছে।” অয়ন মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” সঙ্গীতা ঘরে ফেরার জন্য ঘুরল। দরজার কাছে গিয়ে থামল। “অয়ন…” “হ্যাঁ?” “আজকের কথা কাউকে বলবে না।” অয়ন বলল, “কাউকে না।” “আমাকেও না… কাল।” অয়ন একটু অবাক হলো। “মানে?” সঙ্গীতা চোখ নামিয়ে বলল, “কাল আমি হয়তো এমনভাবে থাকব, যেন কিছু হয়নি। অভ্যাস আছে। তুমি কষ্ট পেও না।” অয়নের বুকের ভেতর কেমন হাহাকার হলো। সে ধীরে বলল, “তুমি না বললেও আজকের কান্না আমি ভুলব না।” সঙ্গীতা আর দাঁড়াল না। ঘরে চলে গেল।
রাতের শেষে অয়ন অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। আজ সঙ্গীতার দুঃখ তার কাছে শুধু অনুভূতি নয়, বাস্তব হয়ে উঠেছে। সন্তান না হওয়া, শাশুড়ির অপমান, সূর্যের নীরবতা—সব মিলিয়ে সে বুঝল, এই বাড়ির ভেতরে সঙ্গীতা শুধু একা নয়, আঘাতপ্রাপ্ত। আর সেই আঘাতের সামনে দাঁড়িয়ে অয়নের মনে এক নতুন অনুভূতি জন্ম নিল। এটা শুধু আকর্ষণ নয়। শুধু মুগ্ধতা নয়। এটা রক্ষা করতে চাওয়ার ইচ্ছে। কাউকে নিজের করে পাওয়ার আগেই তাকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচাতে চাওয়ার নাম কী? অয়ন জানত না। কিন্তু সে বুঝল, এই অনুভূতি আর সাধারণ নেই। অয়নও নিজের ঘরে শুয়ে সঙ্গীতার চোখের জল, তার কাঁপা গলা আর বারান্দায় তার শরীরের কাছাকাছি দাঁড়ানোর অনুভূতি ভুলতে পারছিল না। তার শরীরেও উত্তেজনা জেগে উঠছিল। সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদস্পন্দন দ্রুত। দুজনেই জানত — আজ আরেকটা সীমানা পেরিয়ে গেছে।
সঙ্গীতা নিজের ঘরে ফিরে দেখল, সূর্য এখনও ফেরেনি। ঘড়িতে রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। সে বিছানায় বসে রইল কিছুক্ষণ। আজ অয়ন তার নাম ধরে ডাকল। “সঙ্গীতা।” শব্দটা বারবার কানে বাজছিল। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখের দিকে তাকাল। চোখে কান্নার দাগ, চুল এলোমেলো, মুখ ক্লান্ত। তবু আজ তার মনে হলো, সে শুধু কারও ব্যর্থ বউ নয়। শুধু সন্তানহীন শরীর নয়। শুধু কারও সংসারের দায়িত্ব নয়। সে একজন মানুষ। তার নাম আছে। তার দুঃখ আছে। তার শোনা হওয়ার অধিকার আছে। আর কেউ একজন আজ সেটা তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে। সঙ্গীতা আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম এল না। রাতে সঙ্গীতা বিছানায় শুয়ে বারবার অয়নের বলা “সঙ্গীতা” নামটা শুনছিল। তার শরীরে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছিল। সে নিজের বুকে হাত রাখল। হৃদস্পন্দন দ্রুত। “না,” সে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল, “এভাবে ভাবা যাবে না।” কিন্তু আজ তার শরীরও তার কথা শুনছিল না। মনও না। কারণ আজ অন্ধকারেও তার ভেতরে এক ফোঁটা আলো জ্বলছে। খুব ছোট। খুব বিপজ্জনক। তবু আলো। বাইরে বারান্দার গোলাপগাছের কুঁড়ি নিঃশব্দে ভিজে রাত পেরোচ্ছিল। সকাল হলে হয়তো ফুল ফুটবে। আর হয়তো, সেই ফুলের মতোই, অয়ন আর সঙ্গীতার মাঝেও কিছু একটা নীরবে ফুটতে শুরু করেছে। দুজনেই জানত— আজ আরেকটা সীমানা পেরিয়ে গেছে।
চলবে আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: Ko-fi) ব্যবহার করে সাপোর্ট নেওয়া বা দেওয়া বেশ জটিল। তবুও অনেক পাঠক বন্ধু আমাকে আর্থিকভাবে কিছুটা সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যাতে আমি লেখালেখির এই যাত্রাটি আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সচল রাখতে পারি।আপনারা যারা স্বেচ্ছায় আমাকে কিছুটা সাপোর্ট করতে চান বা 'কফি ট্রিট' দিতে চান, তারা আমার টেলিগ্রামে (Telegram) একটি মেসেজ দিতে পারেন। সেখানে আমি আমার বিকাশ বা নগদ নম্বরটি শেয়ার করব। আমার টেলিগ্রাম আইডি: @sexstorylover24 একটি বিষয় নিশ্চিত করছি: এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয় এবং কাউকে কোনো প্রকার জোর করা হচ্ছে না। গল্প আগের মতোই নিয়মিত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আপনাদের এই ছোট ছোট ভালোবাসা আমাকে আগামীর পর্বগুলো আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে অনেক বড় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। যদি কোনো মতামত থাকে জানাতে ভুলবেন না। আমাকে ইমেইল করতে পারেন [email protected] অথবা টেলিগ্রাম এ এসএমএস দিতে পারেন @sexstorylover24 এই নামে। আপনাদের এসএমএস এ আমি উৎসাহ পাই। তাই আমাকে বেশি বেশি করে উৎসাহ দিবেন এই আশা করি।